আব্দুল কাইয়ুম খান
মাননীয় স্পিকারের সত্যোচ্চারণ ও দুর্নীতির চিত্র
যাইহোক, দেরিতে হলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম একটি অপ্রিয় কিন্তু নির্মম সত্য উচ্চারণ করেছেন। তিনি যথার্থই বলেছেন— "এই রাষ্ট্রের সরকারি কর্মকর্তারা বেশিরভাগই চোর।" আমি ব্যক্তিগতভাবে জাতীয় সংসদের স্পিকারকে আমার সশ্রদ্ধ সেলুট জানাই। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর প্রতীক বা বীর বিক্রম হিসেবে তিনি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করে যে সাহসের সঙ্গে চরম সত্য কথাটি জাতির সামনে তুলে ধরেছেন, তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়।
বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ৫০ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রম করেছে। পাঁচ দশকের এই দীর্ঘ পথচলায় দেশের ভৌত অবকাঠামো, সামষ্টিক অর্থনীতি এবং সামাজিক নানা সূচকে চোখধাঁধানো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু চরম আফসোসের বিষয় হলো, এই অর্জনের আলো আঁধারে ঢেকে দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়া পদ্ধতিগত দুর্নীতি। অনিয়ম ও ঘুস লেনদেনের কারণে সরকারের নাগরিক সেবাসমূহ অত্যন্ত ব্যয়বহুল, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতায় আচ্ছন্ন এবং সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গবেষণা ও জরিপের দিকে তাকালে দেখা যায়, সাধারণ মানুষ যখনই কোনো রাষ্ট্রীয় সেবা নিতে যান, তখনই তারা প্রশাসনিক হয়রানি ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মুখমুখী হতে বাধ্য হন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি ব্যবস্থাপনা, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, ব্যাংক-বীমা খাত কিংবা ছোট-বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প— বাংলাদেশের এমন কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অবশিষ্ট নেই যা কম-বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়নি। কোনো দপ্তরে দুর্নীতি কিছুটা কম, আবার কোনোটিতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে, কিন্তু সার্বিকভাবে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ এখন পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিকড় গেড়ে বসেছে।
নিয়ন্ত্রণের বাইরে আমলাতন্ত্র ও উপেক্ষিত বিকল্প প্রস্তাব
আমি দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অত্যন্ত দায়িত্বের সঙ্গে একটি বাস্তব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে আসছি যে, "বাংলাদেশের সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দুর্নীতিবাজ।" এই অপ্রিয় বাস্তবতার বিষয়টি আমি শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ রাখিনি; বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং জাতীয় পত্রিকার নিবন্ধের মাধ্যমে নিরন্তরভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এমনকি রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ যেন বিষয়টি অনুধাবন করে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে পারেন, সেজন্য তাদের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরেও বিস্তারিত তথ্য পাঠিয়েছে।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আমি তো সমাজের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একজন মানুষ! এই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নীতি-নির্ধারকরা কেন আমার মতো সাধারণ নাগরিকের সতর্কবার্তা শুনবেন? আমি বহুবার স্পষ্ট ভাষায় বলেছি, রাষ্ট্র যদি আমাকে সাময়িকভাবে সুযোগ প্রদান করে, তবে আমি এমন একটি প্রায়োগিক ও আধুনিক ফর্মুলা উপস্থাপন করতে প্রস্তুত, যা সঠিক উপায়ে বাস্তবায়ন করলে রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে অন্তত ৮০ শতাংশ দুর্নীতি নির্মূল হতে বাধ্য। কিন্তু কে শোনে কার কথা! রাষ্ট্র থেকে আমাকে সেই প্রস্তাবনা উপস্থাপনের বা কাজ করার সুযোগটুকু পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
বরং আমরা দেখছি ঠিক উল্টো দৃশ্যপট। যেসব সরকারি কর্মকর্তা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কিংবা যাদের অনিয়ম সর্বজনবিদিত, তাদেরকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। তাদেরকে পদোন্নতি দিয়ে চেয়ার বড় করা হচ্ছে এবং আরও বিপুল অংকের টাকা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন মেগা ও মাঝারি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রজেক্ট ডিরেক্টর বা পিডি বানিয়ে তাদেরকে যেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ লুটপাটের উন্মুক্ত লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে।
রাজনীতি, নির্বাচন ও স্থানীয় সরকারের ভয়াবহ অনিয়ম
দুর্নীতির এই করাল গ্রাস কেবল আমলাতন্ত্রের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি অত্যন্ত জঘন্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে আমাদের স্থানীয় সরকার ও জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বেও। আমি স্পষ্ট বলতে চাই, কেবল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই দুর্নীতিবাজ নন, পাশাপাশি তাদের একটি বিশাল অংশের সাথে রাজনৈতিক নেতারাও সমানভাবে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। অবশ্য আমি সব রাজনৈতিক নেতাকে এক কাতারে ফেলছি না, কিন্তু সিংহভাগ রাজনৈতিক নেতৃত্ব আজ নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে দুর্নীতির ভাগ বাঁটোয়ারায় যুক্ত হয়ে পড়েছেন। তা না হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোটি কোটি টাকা পানি করার মতো খরচ করে কেন মানুষ এমপি কিংবা মন্ত্রী হতে চাইবে? সাধারণ মানুষের মধ্যে দৃঢ় ধারণা জন্মেছে যে, নির্বাচনের সময় যে বিপুল অঙ্কের আর্থিক বিনিয়োগ করা হয়, তা সুদে-আসলে তোলার জন্যই পদে বসার পর সরকারি প্রজেক্ট, টেন্ডার ও সরকারি বরাদ্দকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা হয়।
একই চিত্র আমরা দেখতে পাই তৃণমূলের স্থানীয় সরকার কাঠামোতেও। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনও এখন নিছক জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের জায়গায় নেই, এটি পরিণত হয়েছে কোটি টাকার লাভজনক ব্যবসায়। যে ইউনিয়নের একজন চেয়ারম্যান আনুষ্ঠানিকভাবে মাসে ভাতা পান মাত্র দশ হাজার টাকা, সেই পদে জয়ের জন্য নির্বাচনে প্রার্থীরা ৫০ লাখ, ১ কোটি কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অকাতরে ব্যয় করছেন!
প্রশ্ন উঠতে পারে, দশ হাজার টাকা বেতনের একটি পদের জন্য এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করার মূল মনস্তত্ত্ব ও উদ্দেশ্য কী? অভিযোগের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই বিপুল অর্থ বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্যই হলো— চেয়ারম্যান হিসেবে শপথ নেওয়ার পর গ্রাম্য বিচার-সালিশকে ঘুস বা বাণিজ্যের হাতিয়ার বানানো, সরকারের বরাদ্দকৃত দুস্থদের ত্রাণ ও আর্থিক অনুদান আত্মসাৎ করা এবং ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রজেক্ট ও কাবিখা-টিআরের কাজ থেকে ঠিকাদারদের মাধ্যমে পার্সেন্টেজ আদায় করা। রাজনীতি যখন এভাবে সেবার বদলে ব্যবসায় রূপ নেয়, তখন দুর্নীতিকে ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
একইভাবে দেশের ছোট-বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বারবার প্রজেক্ট ডিরেক্টর (পিডি) বানানোর পেছনে রয়েছে গোপন সিন্ডিকেট। প্রজেক্ট ডিরেক্টর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে প্রকল্পের বাজেট ইচ্ছামতো বাড়ানো হয়, সময়সীমা বারবার বাড়িয়ে অর্থ অপচয় করা হয় এবং দিনশেষে অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ সম্পন্ন করে হাজার হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় আমানত লুটপাট করা হয়।
সামাজিক-অর্থনৈতিক ধস ও সিঙ্গাপুরের শিক্ষা
দুর্নীতির এই জঘন্য সংস্কৃতির ফলে আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিতে চতুর্মুখী সংকট তৈরি হচ্ছে:
১. জনসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত: সাধারণ নাগরিক ও অসচ্ছল জনগণ তাদের মৌলিক পাওনা ও ন্যায্য রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
২. দারিদ্র্য বিমোচনে বাধা ও বৈষম্য বৃদ্ধি: সরকার প্রতি বছর দরিদ্র মানুষের জন্য যে বিপুল পরিমাণ সামাজিক নিরাপত্তা বাজেট ও ত্রাণ বরাদ্দ করে, তার বড় অংশ মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্নীতিবাজদের পেটে চলে যাওয়ায় দরিদ্ররা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।
৩. দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগে আস্থাহীনতা: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ঘুস ছাড়া ফাইল না নড়ার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, একইসাথে দেশীয় উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
৪. আন্তর্জাতিক মন্ডলে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন: আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দুর্নীতিবিষয়ক সূচক ও সংস্থার পর্যালোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান বারবার নিচের দিকে নামছে, যা একটি স্বাধীন ও মর্যাদাশীল জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।
আমরা যদি এই ভয়াবহ দুর্নীতি দূর করতে না পারি, তবে বাহ্যিক যতই বড় বড় দালানকোঠা হোক না কেন, এই রাষ্ট্র কোনোদিন প্রকৃত উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে না। এখানে আমাদের পার্শ্ববর্তী ও পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুরের উদাহরণটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। একসময় সমুদ্রের ছোট একটি নিস্ব দ্বীপ ছাড়া সিঙ্গাপুরের নিজস্ব কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না। কিন্তু তাদের অবিসংবাদিত দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক লি কুয়ান ইউ দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে আপসহীন ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন, তার ওপর ভিত্তি করেই আজ সিঙ্গাপুর পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম ধনী ও সুশাসিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের রয়েছে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদীনালা, উর্বর পলিমাটি এবং বিপুল মানবসম্পদ। এই রাষ্ট্র থেকে যদি দুর্নীতির হার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনা যেত, তবে অনেক আগেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি স্বাবলম্বী ও মর্যাদাশীল উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারত।
দুর্নীতি দূরীকরণে বিশেষ ফর্মুলা ও জরুরি ৬ দফা প্রস্তাবনা
রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এই মহামারীতুল্য দুর্নীতি দূর করার জন্য একটি বিশেষ প্রায়োগিক ফর্মুলা প্রয়োগ করা জরুরি। এই ফর্মুলা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তা তেঁতো কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর ‘কুইনাইন’ ওষুধের মতো প্রশাসনিক দুর্নীতির জীবাণু ধ্বংস করতে কাজ করবে। তবে এ ধরনের যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে হলে আমার মতো সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত চেষ্টার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও সুরক্ষা প্রয়োজন। রাষ্ট্র যদি সদিচ্ছা প্রকাশ করে এবং আমার প্রস্তাবিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রযুক্তি ও ইক্যুইপমেন্ট দিয়ে সহযোগিতা করে, তবে আমি আমার জীবনের শেষ প্রাহ্ণে এসেও বিশ্বাস করি— এ দেশ থেকে দুর্নীতি শতভাগ নির্মূল করা না গেলেও সিংহভাগ দুর্নীতি দূর করতে আমি সক্ষম হব।
আমার বিশেষ পদ্ধতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি অনতিব্লিমে নিয়ন্ত্রণে আনতে আমি নিম্নলিখিত ৬টি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ অবিলম্বে গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছি:
১. সম্পদের বাধ্যতামূলক বার্ষিক হিসাব প্রকাশ: দেশের সকল স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি বছর নিজস্ব ও পরিবারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হালনাগাদ হিসাব দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং তা ডিজিটাল ওয়েবসাইটে জনগণের দেখার জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।
২. কঠোর প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: যে সকল কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পদের হিসাব জমা দিতে ব্যর্থ হবেন, তাদের বেতন-ভাতা, নতুন পে-স্কেলের সুযোগ-সুবিধা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত বা বন্ধ করে দিতে হবে।
৩. অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ: দুদক বা নিরপেক্ষ তদন্তে যাদের অর্জিত সম্পদ তাদের দৃশ্যমান আয়ের উৎসের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অবৈধ প্রমাণিত হবে, তাদের পুরো সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় বাজেয়াপ্ত আইনের মাধ্যমে জাতীয় কোষাগারে জমা করতে হবে।
৪. দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের গেজেট ও সংস্কার: দেশের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিতর্কিত সেবা খাতগুলোকে চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গেজেট প্রকাশ করতে হবে এবং সেসব দপ্তরের প্রশাসনিক কাঠামো আমূল বদলে দিতে নিরপেক্ষ সংস্কার কমিটি গঠন করতে হবে।
৫. বিচার বিভাগে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল: দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট ও অন্যান্য আদালতে স্থগিত হয়ে থাকা রিট ও মামলাগুলো সর্বোচ্চ ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত রায় কার্যকর করতে হবে।
৬. উন্নয়ন প্রজেক্ট ও টেন্ডারে শতভাগ স্বচ্ছতা: জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সকল সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বাজেট রূপরেখা, ই-টেন্ডারিং প্রক্রিয়া এবং দৈনিক ব্যয় বিবরণী অনলাইনে উন্মুক্ত করে দিতে হবে যেন সাধারণ জনগণ ও গণমাধ্যম তা পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
শেষ কথা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি করুণ আকুতি
আমার মতো একজন ক্ষুদ্র ও সাধারণ মানুষকে কি রাষ্ট্র কখনো এত বড় দায়িত্ব দেওয়ার ট্রাস্ট বা আস্থা দেখাবে? এটি নিশ্চিত যে, দুর্নীতি রুখতে রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সর্বোচ্চ অভিভাবক মহলের সরাসরি সহায়তা ছাড়া এককভাবে কোনো নাগরিকের পক্ষে এই দানবকে পরাজিত করা সম্ভব নয়।
আমি আজ এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের সুদৃঢ় ও সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। রাষ্ট্র কি আমাকে সেই সুযোগ ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করবে? যদি সুযোগ দেওয়া হয়, তবে আমি আমার জীবনের শেষ সময়টুকু বাজি রেখে এ দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করার জন্য সর্বাত্মক লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
দুর্নীতি আজ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের সমাজে ও প্রশাসনে এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব— সকল স্তরে বাধ্যতামূলক জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এই ভয়াবহ দানবকে পরাস্ত করা অসম্ভব। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকেরা যদি এখনই কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন, তবে আমাদের আগামী প্রজন্ম একটি পচনশীল ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রকাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পেতে বাধ্য হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
-পরিচালক, দুর্নীতি বিরোধী অভিযান এবং বিশেষ প্রতিনিধি