অনলাইন রিপোর্টার
মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে সরকার। পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত কিংবা কম নম্বর দেওয়ার মতো অনিয়ম ও গাফিলতি প্রতিরোধে আইন ও বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যেই ২০২৫ সালের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অনিয়ম ও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় বেশ কয়েকজন পরীক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নতুন করে পাস হওয়া আইনের আলোকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে পরীক্ষকদের জবাবদিহি জোরদার করা এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
শিক্ষা ও বোর্ড সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য রেকর্ডসংখ্যক ১২ লাখেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে। এত বিপুল সংখ্যক খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জটিল ও কষ্টসাধ্য বিষয় হওয়ায় সরকার পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড ও সীমানা নির্ধারণ করে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে। সম্প্রতি আয়োজিত 'কিউএস (সাইমন্ডস কুয়াকোয়ারেল্লি) বাংলাদেশ ফোরাম ২০২৬'-এর অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সাংবাদিকদের এ বিষয়ে জানান যে, অতিরিক্ত আবেদনের হার বিবেচনা করে পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটিকে শৃঙ্খলায় আনতে একটি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা অত্যন্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছে, যাতে কোনো নির্দিষ্ট ও যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়া খাতা পুনর্মূল্যায়নের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ইচ্ছাকৃত অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে গত ৭ জুলাই জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘দ্য পাবলিক এক্সামিনেশন্স (অফেন্সেস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’। এই সংশোধিত আইন অনুযায়ী, কোনো পরীক্ষক যদি ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তরপত্রে অতিরিক্ত কিংবা কম নম্বর প্রদান করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের স্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। তবে পরীক্ষকের বিরুদ্ধে অপরাধের ভিত্তিতে এই দণ্ড কার্যকর করতে হলে একজন নিরপেক্ষ তৃতীয় পরীক্ষকের মাধ্যমে নম্বর প্রদানের অসঙ্গতি ও গাফিলতি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। ১৯৮০ সালে প্রণীত পুরনো ‘দ্য পাবলিক এক্সামিনেশন্স (অফেন্সেস) অ্যাক্ট’ হালনাগাদ করে সময়োপযোগী এই সংশোধিত রূপ দেওয়া হয়েছে।
নতুন সংশোধিত আইনে কেবল উত্তরপত্র মূল্যায়নই নয়, পরীক্ষার ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও কারসাজি রোধেও কড়া আইনি কঠোরতা যুক্ত হয়েছে। অনুমতি ছাড়া পরীক্ষার ডাটাবেইজে প্রবেশ করা, হ্যাকিং, তথ্য বিকৃত করা কিংবা পরীক্ষার রেকর্ডে যেকোনো কারসাজিসহ ডিজিটাল জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের অর্থদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাবলিক পরীক্ষায় কোনো ধরনের সংঘবদ্ধ জালিয়াতি বা অপরাধ চক্র গঠন করলে কঠোর সাজা প্রদান করা হবে।
ইতিমধ্যেই উত্তরপত্র মূল্যায়নে অনিয়মের দায়ে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির তৈরি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে গুরুতর গাফিলতির সত্যতা পাওয়ায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আটজন পরীক্ষককে পাবলিক পরীক্ষাসংক্রান্ত সব ধরনের কার্যক্রম থেকে আজীবনের জন্য অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তদন্তে প্রমাণিত হয়, তারা নির্ধারিত উত্তরপত্রের ওএমআর (OMR) অংশ নিজেদের দায়িত্বে না রেখে পরীক্ষার্থীদের দিয়ে পূরণ করিয়ে নিয়েছিলেন। শাস্তি পাওয়া আটজন পরীক্ষকের মধ্যে চারজন এসএসসি এবং চারজন এইচএসসি পরীক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।
সরকারের পরিকল্পিত নতুন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যৎ পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। এ বিষয়ে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, ইতোপূর্বে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ায় পরীক্ষকদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। নতুন আইন পাস হয়েছে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ড যৌথভাবে নতুন নীতিমালা প্রণয়নে কাজ করছে। নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার পর নীতিমালার ভিত্তিতে সকল কার্যক্রম পরিচালিত হবে, যাতে কোনো পরীক্ষার্থী প্রকৃত নম্বর থেকে বঞ্চিত না হয় এবং একই সাথে কেউ যেন অতিমূল্যায়িত না হয়।
ঢাকা টুডে / আরজে