ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সরলো বঙ্গবন্ধুর একক ছবি, যুক্ত হলো জিন্নাহ ও জুলাই অভ্যুত্থান মমেকের ৩য় তলায় শিশু ওয়ার্ডে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস শিল্পে গ্যাস সরবরাহ মঙ্গলবার থেকেই স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রধানমন্ত্রীর ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাব ছাড়াল ১ লাখ ৪১ হাজার কাশফুল শুধু সৌন্দর্য নয়, অনেকের জীবিকাও বটে তাড়াশে গোয়ালঘরের তালা ভেঙে ৮টি গরু চুরি, নিঃস্ব কৃষক পরিবার ডেঙ্গুতে আরও ৮ জনের মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৭৩৩ জন ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াতের অনানুষ্ঠানিক মেয়র প্রার্থী ঘোষণা চারবার গুলিবিদ্ধ ও তিনবার কারাবরণ: ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আলোচনায় ইশরাক অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান

ডাকসু সংগ্রহশালায় বড় রদবদল

সরলো বঙ্গবন্ধুর একক ছবি, যুক্ত হলো জিন্নাহ ও জুলাই অভ্যুত্থান


  • আপলোড সময় : সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ৮:৫১ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালা নতুনভাবে সংস্কারের পর উন্মুক্ত করাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনের আগে সংগ্রহশালাটিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামের আলোকচিত্র ও নিদর্শনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ছবি রক্ষিত ছিল। তবে দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকার পর রোববার সংগ্রহশালাটি নতুন রূপরেখায় উন্মুক্ত করার পর সেখানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা হয়।


সংগ্রহশালা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের সব একক ছবি সরিয়ে ফেলা এবং একই সাথে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত করার ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে সোমবার সকালে জিন্নাহর ছবি টাঙানো নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে একপর্যায়ে তা ভাঙচুর ও ছিঁড়ে ফেলা হয়। একই সাথে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতের সাবেক আমির, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আমৃত্যু দণ্ডপ্রাপ্ত (পরে প্রয়াত) গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ঐতিহাসিক ছবি সংগ্রহশালায় টাঙিয়ে দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফেডারেশনের নেতা-কর্মীরা।


সংগ্রহশালা সূত্রে ও সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন করে সাজানো এই সংগ্রহশালায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা, ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রদর্শিত কোনো ছবিতেই শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক ছবি রাখা হয়নি। তবে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সময়কালের অংশে ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর দুই ছেলের বিয়ের ছবি এবং কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংক্রান্ত একটি সংবাদ সংবলিত পেপার কাটিং বাঁধাই করে রাখা হয়েছে। এছাড়া 'বাংলাদেশে কোনো বিরোধী দল নেই' শীর্ষক সংবাদের পেপার কাটিং এবং ১৯৭৪ সালের দুস্থ ও দুর্ভিক্ষ পীড়িত চিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে।


অন্যদিকে, সংগ্রহশালায় প্রদর্শনের জন্য টাঙানো পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবির মধ্যে একটি ছিল ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণের স্থিরচিত্র, যে ভাষণে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার একতরফা ঘোষণা দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় ছবিটি ছিল ১৯৪০ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনে নেতৃবৃন্দের দলগত ছবি এবং তৃতীয়টি ছিল ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন নিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের খবরের কাটিং। সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর এই তিনটি ছবি সরেজমিনে ছিঁড়ে ফেলেন আবু তৈয়ব হাবিলদার নামের এক শিক্ষার্থী। জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভাষা আন্দোলনের চেতনার সাথে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক এবং এই ঘটনার পেছনে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধুর কোনো একক ছবি না থাকা এবং জিন্নাহর ছবি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সংগ্রহশালার সংস্কার ও পুনর্গঠন কাজের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকা ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিবাদের সব আইকনের ছবি সরিয়ে ফেলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি এককভাবে এটি সরাননি। তিনি দাবি করেন, নতুন করে সংগ্রহশালা সাজানোর সময় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন বিষয়কে বস্তুনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা হয়েছে।


এর মধ্যে ৭ মার্চের ভাষণের বিষয়, ছয় দফা আন্দোলন এবং সেক্টর কমান্ডারদের ছবি যুক্ত করা হয়েছে। ১৯৭১-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়কালের মুজিবের ছবি রাখা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একক ছবি একদমই রাখা হয়নি—বিষয়টি তেমন নয়। ছয় দফা আন্দোলনের ছবি এবং ৭ মার্চের ভাষণ সংবলিত একটি কাঠের আর্টওয়ার্ক প্রদর্শনীতে রয়েছে। আর জিন্নাহর ছবি প্রসঙ্গে তিনি ব্যাখায় বলেন, জিন্নাহর ছবির সাথে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ক্যাপশন যুক্ত ছিল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া তাঁর ভাষণের ঐতিহাসিক সূত্রের কারণেই ছবিটি রাখা হয়েছিল। জিন্নাহকে কোনোভাবেই গৌরবান্বিত করা বা তাঁর আদর্শের পক্ষে প্রচারণা চালানো উদ্দেশ্যে ছিল না, বরং তিনি যেসব ঐতিহাসিক ইভেন্টের সাথে যুক্ত ছিলেন কেবল সেগুলোরই বস্তুনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল।


নব-সংগঠিত ডাকসু সংগ্রহশালায় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঐতিহাসিক মাইলফলক সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নানা দুর্লভ আলোকচিত্র এতে স্থান পেয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণের পাশাপাশি সে সময়কার আন্দোলনের কিছু দুর্লভ চিত্র এবং কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীর বিখ্যাত ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতার অংশ ও ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক পিয়ারু সরদারের ছবি স্থান পেয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের অংশে ১১টি সেক্টরের কমান্ডারবৃন্দ, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের মুহূর্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মুখাবয়ব এবং সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবি পরম শ্রদ্ধায় রাখা হয়েছে। এসব ছবির নিচের অংশে মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবদানের একটি খোদাই করা অনন্য শিল্পকর্ম রাখা হয়েছে।


এছাড়া সংগ্রহশালায় দেশের সার্বিক রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারা তুলে ধরতে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, নবাব সলিমুল্লাহ, এম এ জি ওসমানী এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ব্যক্তিত্বের ছবি রাখা হয়েছে। জিয়াউর রহমানের আমলের স্মৃতি হিসেবে তাঁর খাল খনন কর্মসূচি, বেগম খালেদা জিয়ার সাথে তাঁর একটি দুর্লভ স্থিরচিত্র, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়ের দুটি ছবি এবং ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবহৃত ব্যালট পেপারের একটি ছবি ঠাঁই পেয়েছে।


একই সাথে আশির দশকে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের ১৪টি কালজয়ী স্থিরচিত্র সেখানে শোভা পাচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে শহীদ নূর হোসেনের পিঠে ও বুকে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখা ঐতিহাসিক সেই আইকনিক ছবি। এছাড়া ডাকসুর স্বৈরাচারবিরোধী ভূমিকার দলিল, ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত আন্দোলনের শহীদদের নামসংবলিত পূর্ণাঙ্গ তালিকা এবং শহীদ আসাদকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো স্পর্শকাতর দৃশ্য স্থান পেয়েছে। পরবর্তী সময়কালের চিত্রে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১৩ সালের দিকে সংঘটিত হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা শাহবাগ আন্দোলন, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ও সানি হত্যাকাণ্ড, ২০২০ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ নানা আলোকচিত্র ঠাঁই পেয়েছে।


জাতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, আবুল কাশেম ফজলুল হক, শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী ও আবুল ফজলসহ বরেণ্য সাহিত্যিকদের ছবিও স্বমর্যাদায় রাখা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের অংশ হিসেবে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদীর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা, সিঙ্গাপুর থেকে তাঁর মরদেহ দেশে আনা, জানাজা এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে তাঁর দাফনের করুণ আলোকচিত্রও সংরক্ষণ করা হয়েছে।


তবে সংগ্রহশালার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অর্থাৎ ডাকসুতে নির্বাচিতদের ড্যাশবোর্ডে ২০১৯ সালের ঐতিহাসিক ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ী সহ-সভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরের নাম সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকলেও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদের জায়গাটি রহস্যজনকভাবে ফাঁকা রাখা হয়েছে। ২০১৯ সালের নির্বাচনে জিএস পদে জয়লাভ করেছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। পরবর্তীতে তাঁর ছাত্রত্ব না থাকা এবং জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁর পদ নিয়ে আইনি জটিলতায় পড়ে এবং রাশেদ খানকে উক্ত পদে বহাল করার বিষয়টি আলোচনায় আসে।


এই বিষয়ে ফাতিমা তাসনিম জুমা জানান, ২০১৯ সালের জিএস পদ নিয়ে এখনো কিছু প্রশাসনিক ও আইনি বিতর্ক রয়ে গেছে। বিষয়টির পেছনের সিদ্ধান্ত সিন্ডিকেটে পাস হলেও তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট বিধিমালার স্পষ্টতার অভাব রয়েছে। আবার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে কাউকেই পদটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বাসনের কোনো নিয়ম নেই। তাই বিভ্রান্তি ও বিতর্ক এড়াতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত জিএস পদের স্থানটি আপাতত খালি রাখা হয়েছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর