ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
৯০ দিন বাড়ল ডাকসুর সময়সীমা, তফসিল ঘোষণাতেই বাতিল হবে কমিটি হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩১৬ ডেঙ্গুতে একদিনে আরও ৮ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৫৯৩ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যেই চীন সফরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি কিম জং উনের ছেলে সন্তান ঘিরে রহস্য, উত্তরসূরি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তর্ক বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগের আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ডিএসসিসি কার্যালয়ে প্রশাসকের ঝটিকা পরিদর্শন জ্বালানি হামলা বন্ধের প্রস্তাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কী বলল মস্কো? পবিত্র মক্কা, জেদ্দা ও তাইফে জরুরি সতর্কতা জারি করল সৌদি আরব ৭ জনের ফাঁসির রায়ে ককটেল বিস্ফোরণ বড় বিষয় নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

হাদি হত্যা মামলার আসামি ফেরাতে ইন্টারপোলের চিঠি, নীরব ভারত


  • আপলোড সময় : বুধবার ০১ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ৫:৪৭ পিএম

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া এই মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে পুলিশ ইন্টারপোলের মাধ্যমে একাধিকবার চিঠি পাঠালেও এখন পর্যন্ত ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি এখন কূটনৈতিক পর্যায়ে সমাধানের চেষ্টা করছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পুলিশ সদরদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্দিবিনিময় চুক্তি থাকায় হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের এনসিবি বিভাগ ইন্টারপোলের মাধ্যমে ভারতীয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়ে তাদের প্রত্যাবর্তনের অনুরোধ জানায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই চিঠির কোনো জবাব দেয়নি ভারত।

পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই বাংলাদেশ পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে। গ্রেপ্তারের কিছুদিনের মধ্যেই ইন্টারপোলের মাধ্যমে ভারতীয় সংশ্লিষ্ট বিভাগকে চিঠি পাঠিয়ে তাদের বাংলাদেশে হস্তান্তরের অনুরোধ জানানো হয়। তবে এখন পর্যন্ত ভারতীয় পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

পুলিশের পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়ায় এখন বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যমান বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে বাংলাদেশ। বিষয়টি এখন উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ভারত এখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে ‘কনস্যুলার অ্যাক্সেস’ দেয়নি। অর্থাৎ বাংলাদেশি কর্মকর্তারা এখনো ওই দুই আসামিকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ পাননি। তবে এ সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

অন্য একটি সূত্রের দাবি, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বর্তমানে গ্রেপ্তার আসামিদের নিজেদের হেফাজতে রেখে তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ চালাচ্ছে। বিশেষ কিছু তথ্য সংগ্রহের জন্য তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের হস্তান্তরের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে চাইছে না ভারত।

এদিকে আগামী ৭ এপ্রিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরের কথা রয়েছে। এই সফরকে ঘিরে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই বৈঠকে হাদি হত্যা মামলার আসামিদের বাংলাদেশে হস্তান্তরের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া সফরের সময় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরির সঙ্গেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, এসব বৈঠকের মাধ্যমে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় আসামিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে।

গত ২৪ মার্চ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা এখনও ‘কনস্যুলার অ্যাক্সেস’ পায়নি। তবে সরকার দ্রুত তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে ভারতে অবস্থানরত অন্য আসামিদের বিষয়েও দেশটির হাইকমিশনারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় ভারতে গ্রেপ্তার আসামিদের ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। বিদ্যমান বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে বর্তমানে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ (NIA)। গত ২৩ মার্চ উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বিধাননগর মহকুমা বিচার বিভাগীয় আদালতে এনআইএ তাদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানালে আদালত তা মঞ্জুর করেন। একই ঘটনায় সীমান্ত পার হতে সহায়তা করার অভিযোগে গ্রেপ্তার ফিলিপ সাংমাকে আদালতের নির্দেশে জেলহাজতে রাখা হয়েছে।

এর আগে গত ৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বনগাঁ এলাকা থেকে ফয়সাল ও আলমগীরকে আটক করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স (STF)। অনুপ্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর তাদের ১৪ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ড শেষে গত ২২ মার্চ আদালত তাদের ১২ দিনের জন্য জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আদালতে নেওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফয়সাল করিম মাসুদ নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমি এই কাজ করিনি। এসব ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’

তবে বাংলাদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এই অভিযান পরিচালনা করেছিল বলে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার এক শীর্ষ কর্মকর্তার সাম্প্রতিক ভারত সফরের পর থেকে দেশটিতে পালিয়ে থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

এদিকে শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এই মামলায় ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। গত ৬ জানুয়ারি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন এবং পরিকল্পিতভাবে শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তদন্তে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় মাসুদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ১২ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তদন্তে আরও জানা যায়, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ডিএনসিসি ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর নির্দেশেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে জুমার নামাজ শেষে গণসংযোগ করার সময় মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তির গুলিতে গুরুতর আহত হন শরিফ ওসমান হাদি। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।

ঢাকা টুডে / আরজে


এ সম্পর্কিত আরো খবর