জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁর জামিন আবেদনও নাকচ করা হয়েছে। রাজধানীর লালবাগ থানায় করা একটি মামলায় তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে শুনানি শেষে এই আদেশ দেন বিচারক।
আজ মঙ্গলবার বেলা একটার পর শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয় থেকে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নেওয়া হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে ডিবির পক্ষ থেকে তাঁকে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়।
ডিবির আবেদনে বলা হয়, গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতা, ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টার একটি মামলার তদন্তের স্বার্থে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। মামলার পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্ত, তাঁদের গ্রেপ্তার এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের জন্য তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে আসামিপক্ষ রিমান্ড আবেদন বাতিল চেয়ে আদালতে জামিন আবেদন করেন। তবে শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড ও জামিন—উভয় আবেদনই নামঞ্জুর করেন এবং শিরীন শারমিন চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মোহসীন উদ্দীন আদালতের কাছে রিমান্ড আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের অংশ হিসেবে লালবাগের আজিমপুর সরকারি কলোনি এলাকায় নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা শান্তিপূর্ণ মিছিল করছিলেন। এ সময় আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীরা দেশীয় ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করেন।
এই ঘটনায় আন্দোলনকারী মো. আশরাফুল ফাহিম গুরুতর আহত হন। তাঁর বাঁ চোখ, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি লাগে। পরে তাঁকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করেন। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে অস্ত্রোপচার করা হয় এবং পরবর্তীতে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। চিকিৎসকদের মতে, এ ঘটনায় তাঁর বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায়।
মামলার বাদী মো. আশরাফুল অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিপ্লব বড়ুয়া, ওবায়দুল কাদের ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পরিকল্পনা ও নির্দেশে পুলিশ সদস্য এবং অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করেন। এই মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলাকালে ওই দিন প্রায় ৩১ জন আন্দোলনকারী নিহত হন। মামলার প্রধান আসামি শেখ হাসিনাসহ অন্য আসামিরা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তাঁদের পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নির্দেশে এই ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়।
ডিবির আবেদনে আরও বলা হয়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শিরীন শারমিন চৌধুরী তাঁর নাম-ঠিকানা নিশ্চিত করেন এবং মামলার ঘটনার বিষয়ে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানান। তবে পলাতক আসামিদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কৌশলে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান বলে দাবি করা হয়।
ডিবি আরও জানায়, তাঁকে পুলিশ হেফাজতে এনে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে পলাতক আসামিদের অবস্থান নির্ণয়, তাঁদের গ্রেপ্তার এবং মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি, আসামি জামিনে মুক্তি পেলে তিনি পলাতক হয়ে যেতে পারেন এবং তদন্তে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
এর আগে আজ ভোরে ধানমন্ডিতে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয় এবং ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ তাঁর বিরুদ্ধে মোট ছয়টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনটি মামলায় ইতোমধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে এবং বাকি তিনটি মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের মামলায় রিমান্ড ও জামিন বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত মামলার প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ, অভিযোগের গুরুত্ব এবং তদন্তের প্রয়োজনীয়তার ওপর নির্ভর করে। আদালত সাধারণত এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।
সামগ্রিকভাবে এই মামলাটি দেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে একজন সাবেক স্পিকারকে ঘিরে এমন আইনি পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। এখন মামলার পরবর্তী অগ্রগতি এবং তদন্তের ফলাফল কী দাঁড়ায়, সেদিকেই সবার নজর রয়েছে।