২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন ঘিরে শাপলা চত্বরের ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার (৫ মে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি আরও জানান, এই মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে শেখ হাসিনাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শাপলা চত্বরের ঘটনায় তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি দাবি করেন, হেফাজতে ইসলামকে দমন করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল।
তিনি জানান, এ ঘটনায় তদন্ত কাজের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ৭ জুনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। মামলায় ৩০ জনের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৫ মে পবিত্র কোরআন ও মহানবী (সা.)-এর প্রতি অবমাননার প্রতিবাদ এবং ১৩ দফা দাবিতে হেফাজতে ইসলাম ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ওই দিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আলেম, মাদরাসাশিক্ষার্থী ও সমর্থকরা রাজধানীতে সমবেত হন এবং কর্মসূচি শেষে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন।
সারাদিন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে সন্ধ্যার আগেই সমাবেশস্থলে দুজনের মরদেহ আনা হয়। পরে মধ্যরাতে যৌথ বাহিনী অভিযান চালালে পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয়। গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহারের মধ্যে সমাবেশ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
এ ঘটনার নিহতের সংখ্যা নিয়ে শুরু থেকেই ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে আসে। ২০২৫ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম তাদের পক্ষ থেকে ৯৩ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করে। তারা জানায়, যাচাই-বাছাই শেষে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এর আগে, ২০২১ সালের ১০ জুন মানবাধিকার সংগঠন অধিকার তাদের এক প্রতিবেদনে ৬১ জনের নাম সংগ্রহের কথা জানায়। ২০১৪ সালে ‘শহিদনামা’ নামে একটি গ্রন্থে ৪১ জন নিহতের তথ্য উল্লেখ করা হয়।
ঘটনার ১৩ বছর পার হলেও এখনো বিচার সম্পন্ন হয়নি। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি অভিযোগ দাখিল করেন।
ওই অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ মোট ৫৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, সাবেক তিন পুলিশপ্রধান হাসান মাহমুদ খন্দকার, বেনজীর আহমেদ ও এ কে এম শহিদুল হক এবং পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক মোল্যা নজরুল ইসলামকেও আসামির তালিকায় রাখা হয়েছে।
আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বর্তমানে কারাগারে আছেন এবং বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজও এগিয়ে চলছে বলে তিনি জানান।
সবশেষে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, শাপলা চত্বরের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে এবং দীর্ঘদিনের এই আলোচিত ঘটনার একটি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।