ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
৯০ দিন বাড়ল ডাকসুর সময়সীমা, তফসিল ঘোষণাতেই বাতিল হবে কমিটি হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩১৬ ডেঙ্গুতে একদিনে আরও ৮ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৫৯৩ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যেই চীন সফরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি কিম জং উনের ছেলে সন্তান ঘিরে রহস্য, উত্তরসূরি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তর্ক বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগের আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ডিএসসিসি কার্যালয়ে প্রশাসকের ঝটিকা পরিদর্শন জ্বালানি হামলা বন্ধের প্রস্তাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কী বলল মস্কো? পবিত্র মক্কা, জেদ্দা ও তাইফে জরুরি সতর্কতা জারি করল সৌদি আরব ৭ জনের ফাঁসির রায়ে ককটেল বিস্ফোরণ বড় বিষয় নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দেশজুড়ে পরীক্ষা ব্যাহত

হাম ছড়িয়ে পড়ার মাঝেই আবার কিটসংকট


  • আপলোড সময় : বুধবার ০৬ মে, ২০২৬ সময় : ১০:২২ এএম

দেশজুড়ে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকায় রোগ শনাক্তের পরীক্ষার চাহিদা বেড়েছে, তবে ঠিক এই সময়েই আবারও কিটসংকটে পড়েছে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা। প্রয়োজনীয় কিটের অভাবে পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে হাজার হাজার নমুনা পরীক্ষার অপেক্ষায় জমে আছে।

রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিতে গিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে কিটস্বল্পতার কারণে দৈনিক সীমিত সংখ্যক নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. মোমিনুর রহমান জানান, তারা প্রতিদিন গড়ে প্রায় একশটি নমুনা পরীক্ষা করতে পারছেন। তবে এর বেশি তথ্য দিতে তিনি অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।

ল্যাবরেটরি সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে পাঠানো প্রায় পাঁচ হাজার রোগীর নমুনা জমা হয়ে আছে। কিটসংকটের কারণে এসব নমুনা দ্রুত পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। নতুন কিট আসার আগেই নমুনার সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দেশজুড়ে হাম ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এ রোগ শনাক্তের পরীক্ষা করানোর আগ্রহ বেড়েছে। বিশেষ করে যেসব শিশুর শরীরে হাম-সদৃশ উপসর্গ দেখা যাচ্ছে, তাদের অভিভাবকেরা নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরীক্ষা করাতে চাইছেন। একই সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হতে পরীক্ষা করানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।

কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল পেতে বিলম্ব হওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিতে দেরি হচ্ছে, কারণ নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে না তারা হামে আক্রান্ত কি না। এতে হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়ছে এবং রোগীদের ভোগান্তিও দীর্ঘ হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, হামের মতো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় কিটসংকট একটি বড় ধরনের ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। তারা বলছেন, সময়মতো কিট সংগ্রহ এবং সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এই সংকট এড়ানো সম্ভব ছিল।

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, “হামের এই প্রাদুর্ভাবের সময় রোগ শনাক্তের কিট না থাকা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা অফিস যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। দায়ভার তারা এড়াতে পারে না।” তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে বিকল্প উৎস থেকে কিট সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হবে।

জানা গেছে, দেশে হাম শনাক্তের কিট সরবরাহ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং এই কিট ছাড়া অন্য কোনো উৎসের কিট ব্যবহার করা হয় না। একটি কিট দিয়ে প্রায় ৯০টি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরির দৈনিক প্রায় ৩০০ নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা থাকলেও কিটের অভাবে সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

গত মাসেও একই ধরনের সংকটে পড়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে ৬০টি কিট চেয়ে চিঠি দিয়েছিল। তবে সেই কিট সরবরাহ করা হয় ১৯ এপ্রিল। এরপর ৩০ এপ্রিল বা ১ মে আরও ১০০ কিট দেওয়ার কথা থাকলেও তা এখনো পাওয়া যায়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন করে ১০০টি কিট সরবরাহ করতে দেড় থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশকে ৩০টি কিট দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা এক সপ্তাহের মধ্যে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সরবরাহ যথেষ্ট নয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে আরও বেশি কিট সংগ্রহ করতে না পারলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ২৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে ৫৪ শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দুইজনের ক্ষেত্রে হাম নিশ্চিত করা হয়েছিল।

একই সময়ে প্রায় ৪২ হাজার ৯৭৯ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এদের মধ্যে ২৯ হাজার ৮৩১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২৬ হাজার ৩৬৮ শিশু।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো সংক্রামক রোগ দ্রুত শনাক্ত করা না গেলে তা আরও বিস্তার লাভ করতে পারে। তাই দ্রুত পরীক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কিটসংকটের কারণে যদি পরীক্ষা বিলম্বিত হয়, তাহলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দ্রুত কিট সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা এবং পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো—এই তিনটি বিষয় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। কারণ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এমন ঘাটতি থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর