রাজধানী ঢাকার মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সামগ্রিক বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাতের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি উঠেছে। দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের জরুরি চিকিৎসা সেবার মান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই, দেশজুড়ে নানামুখী অনিয়ম প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোর্ট বা আদালত পরিচালনা এবং আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সংঘটিত একসঙ্গে ছয়টি নিরীহ নবজাতক শিশুর মৃত্যুর চাঞ্চল্যকর ঘটনায় হাইকোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবিতে সরকারকে একটি আইনি বা লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
দেশের বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র্যাবের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট আটটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ঠিকানায় এই নোটিশ রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে। আজ রোববার (৩১ মে) সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিলের (NLC) সম্মানিত চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস. এম. জুলফিকার আলী জুনু জনস্বার্থে এই লিগ্যাল নোটিশটি প্রেরণ করেন।
প্রেরিত লিগ্যাল নোটিশে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে দেশের প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের জীবন রক্ষা, মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি এবং সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ও মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে স্বীকৃত। রাষ্ট্রের পবিত্র কর্তব্য হচ্ছে দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ, মানসম্পন্ন, কার্যকর এবং পুরোপুরি জবাবদিহিমূলক পেশাদার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় গড়ে ওঠা ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসাসেবার নূন্যতম মান, বৈধ লাইসেন্স বা অনুমোদন, যথাযথ প্রশিক্ষিত জনবল, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা, আইসিইউ (ICU), সিসিইউ (CCU), এইচডিইউ (HDU) এবং বিশেষ করে নবজাতকদের জরুরি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা এনআইসিইউ (NICU)-সহ জীবনরক্ষাকারী অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ধরনের গুরুতর অনিয়ম, চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি আদ্-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয়টি ফুটফুটে শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় সমগ্র দেশব্যাপী গভীর উদ্বেগ, শোক, ক্ষোভ ও চরম উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে।
এই লোমহর্ষক ঘটনার প্রকৃত এবং সঠিক কারণ উদঘাটন করা, দায়ী ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের কঠোর আইনি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি পুরোপুরি রোধ করার লক্ষ্যে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় সময়ের দাবি।
প্রেরিত ওই আইনি নোটিশে জনস্বার্থে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও রোগী নিরাপত্তা নিশ্চিতে অবিলম্বে আটটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমত রয়েছে— দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ প্রশাসনিক তদারকি ও চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে হাসপাতালগুলোর হালনাগাদ লাইসেন্স, সরকারি অনুমোদন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং রোগী নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোরভাবে যাচাই করা। তৃতীয়ত, আইসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউ এবং এনআইসিইউ-সহ সব ধরনের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, নির্বিঘ্ন অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা ও সার্বিক কার্যকারিতা পুনরায় পরীক্ষা করা।
চতুর্থত, কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং সংশ্লিষ্ট মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বৈধ প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধন, পেশাগত যোগ্যতা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সঠিকভাবে যাচাই করা। পঞ্চমত, অনুমোদনবিহীন, মানহীন অথবা দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণামূলক কায়দায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ভুয়া হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স বাতিলসহ তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ষষ্ঠত, আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সংঘটিত ছয় শিশুর মৃত্যুর মূল রহস্য উদঘাটনে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের একজন বিজ্ঞ বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা। সপ্তমত, সেই তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে দ্রুত প্রকাশ এবং দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ফৌজদারি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং অষ্টমত, সন্তানহারা ও চরম ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক ও মানসিক সহায়তা প্রদান করা।
নোটিশ প্রাপ্তির আগামী ১৫ (পনেরো) দিনের মধ্যে উপরোক্ত বিষয়গুলোতে কার্যকর, দৃশ্যমান ও সন্তোষজনক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যথায় দেশের সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থে দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের আলোকে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বহীন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত প্রতিকার, মহামান্য হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদনসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে নোটিশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।