জাতীয় সংসদকে সরকারি ও বিরোধী দল—এই দুই ‘টায়ারের’ ওপর চলা একটি গতিশীল যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যেকোনো একটি টায়ার অকেজো হয়ে গেলে রাষ্ট্ররূপী এই যান আর সামনে চলবে না। তাই বিরোধী দলকে নানাভাবে দুর্বল করার অপচেষ্টা না করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংসদীয় সম্মান ও সহযোগিতার সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে অতীতের সংসদীয় ‘ব্যাড কালচার’, তোষামোদি রাজনীতি, ব্যক্তিপূজা ও চরিত্রহননের নোংরা অধ্যায় থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আজ সোমবার (২৯ জুন) সকালে জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা এই আহ্বান জানান। সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ সংসদের এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন শুরু হয়।
প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর বিরোধী দলের নেতা হিসেবে সমাপনী বক্তব্য দেন ডা. শফিকুর রহমান। বাজেট আলোচনায় অংশ নেওয়া সব সংসদ সদস্যকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই সংসদেরও দুইটা টায়ার। একটা সরকারি দল, আরেকটা বিরোধী দল। যেকোনো একটা টায়ার অকেজো হয়ে গেলে যান চলবে না। এক টায়ারে আপনি পিন লাগাবেন, পেরেক মারবেন, তাহলে কিন্তু ওই টায়ারটা ফুটো হয়ে যাবে। ওইটা ফুটো হয়ে গেলে অন্য টায়ারটাও আর চলবে না।’
সংসদে বিরোধী দলকে কুচি কুচি করে কাটার মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘একটা চমৎকার টেন্ডেন্সি আমরা লক্ষ্য করছি, প্রায় সকলেই কুচি কুচি করে কাটার পরে বলেন, এগুলা ছাড়েন, আমাদের সঙ্গে চলে আসেন। আমরা ওই কুচি কুচি করার জন্য পবিত্র সংসদে আসি নাই।’ তিনি স্পষ্ট করেন, এর অর্থ এই নয় যে সরকারি দল যা চাইবে, বিরোধী দল চোখ বন্ধ করে সেটাই সমর্থন করবে; আবার কেবল বিরোধিতার খাতিরে সরকারের সবকিছুর অন্ধ বিরোধিতাও করা উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘সরকারি দলকেও বিরোধী দলকে সম্মান করার মানসিকতা থাকতে হবে, আর বিরোধী দলেরও সংগত ও জনকল্যাণমূলক সব বিষয়ে সরকারকে নিঃশর্ত সহযোগিতা করার মানসিকতা থাকতে হবে।’
জামায়াতের আমির অতীতের একতরফা সংসদীয় চর্চার সমালোচনা করে বলেন, ‘অতীতের সংসদে দায়িত্বরত ব্যক্তিকে তোষামোদ করার জন্য গান হয়েছে, কবিতা হয়েছে, অবাস্তব স্বপ্নবিলাস হয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে এই সংসদে এটা দেওয়া মোটেও উচিত নয়। সংসদ তোষামোদের জায়গা নয়, এটা জনগণের পবিত্র আমানত ও দায়িত্ব পালনের জায়গা।’ স্পিকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়ে বিরোধী দলের নেতা বলেন, ‘অতীতের সেই রাজনৈতিক ব্যাড কালচারকে আমরা একযোগে “না” বলি। বিশেষ করে এই সংসদে যেন কারও চরিত্রহননের কোনো কাজ না হয়।’
বাজেটের বিভিন্ন খাতের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বিরোধী দলের নেতা কওমি মাদ্রাসার জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা, বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল অর্থ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত সংস্কার এবং রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রবাসীদের নানামুখী সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়মিত মূল্যায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসার লাখ লাখ শিক্ষার্থীরাও এই রাষ্ট্রের সমান নাগরিক। তাই তাদেরও রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও বাজেট বরাদ্দ পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তিনি কওমি মাদ্রাসাগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রেখেই সরকারি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়েও সরকারকে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান। কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর ঝুলিয়ে না রাখার আহ্বান জানান জামায়াত আমির।
উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিরোধী দলের নেতা বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সার্টিফিকেট দেওয়ার কেন্দ্র না বানিয়ে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় যদি রিসার্চবেজড না হয়, তাহলে চিরজীবন আমরা আমদানিনির্ভরই থেকে যাব।’ গবেষণার জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দিয়ে দেশের অন্তত কয়েকটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়ারও প্রস্তাব করেন তিনি। এছাড়া পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বৈষম্যের কথা তুলে ধরে জামায়াতের আমির বলেন, এসব মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা গেলে সেখানে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।
স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর চিত্র তুলে ধরে বিরোধী দলের নেতা বলেন, নতুন নতুন চাকচিক্যময় অবকাঠামো নির্মাণের আগে বিদ্যমান সরকারি হাসপাতালগুলোর জনবল সংকট দূর করা, আধুনিক সরঞ্জাম ও সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে একই ধরনের কঠোর তদারকি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বেশি হলেও সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে একই মানদণ্ড প্রয়োগ হয় না। বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল আকস্মিক বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে শফিকুর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক, তবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়।
বাজেটে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি রূপরেখা না থাকায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেন বিরোধী দলের নেতা। তিনি তথ্য দিয়ে বলেন, ‘গত সাড়ে ১৫ বছরে দেশ থেকে যে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, ওই পাচারকৃত অর্থের নয় ভাগের এক ভাগও যদি আগামী অর্থবছরে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে আমাদের কোনো বাজেট–ঘাটতি থাকবে না।’ এ প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির আরও বলেন, ‘সম্পদের সঙ্গে কালপ্রিটদেরও (অর্থ পাচারকারী) দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। সম্পদ এল, আর কালপ্রিটরা বহাল তবিয়তে বিদেশে থেকে গেল, তাহলে সঠিক শিক্ষা হবে না।’ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা করে দ্রুততম সময়ে অর্থ ফিরিয়ে আনার তাগিদ দেন তিনি। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের ওপর অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ অর্থ আদায়ের চাপ কমাতে হবে। তাঁর ভাষায়, ‘ট্যাক্স শুধু একটাই হবে, দ্বিতীয়টা আর তৃতীয়টা থাকবে না। ঘুষ ও চাঁদাবাজি বন্ধ হলে ব্যবসায়ীরা আরও বেশি ট্যাক্স দিতে আগ্রহী হবে।’
প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বিরোধী দলের নেতা জাতীয় সংসদের অধীন একটি ‘বিশেষ টাস্কফোর্স’ গঠনের প্রস্তাব দেন। মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারি সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ভয়াবহ অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, যেখানে সরকারি রেট অনুযায়ী মাত্র ৮৫ হাজার টাকায় যাওয়ার কথা, সেখানে সিন্ডিকেটের কারণে নিরীহ শ্রমিকদের কাছ থেকে ৬–৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই শোষণের সিন্ডিকেট অবিলম্বে ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বাজেটে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা অব্যাহত রাখার সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে জামায়াতের আমির অতীতে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মীদেরও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পুনর্বাসনের দাবি জানান। একই সঙ্গে বিচার কার্যক্রমের গতি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী কালপ্রিটদের—তারা যত বড়ই শক্তিশালী হোক না কেন—দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
বাজেট বাস্তবায়নে নিয়মিত মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বিরোধী দলের নেতা বলেন, প্রতি তিন বা চার মাস অন্তর বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন সংসদে পেশ করা উচিত। পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থবছর প্রচলিত জুলাই-জুনের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক নিয়মে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করারও বৈপ্লবিক প্রস্তাব দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ দিকে ডা. শফিকুর রহমান সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের চার লেন প্রকল্প দ্রুত শেষ করা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান, বহুল প্রতীক্ষিত ভোলা সেতু নির্মাণ এবং প্রধান নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের সহযোগিতায় নেওয়া মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেন। সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আমরা নামের কাঙাল নই, আমরা কাজের কাঙাল। কাজটাই দেখতে চাই।’
সবশেষে স্পিকারকে চমৎকারভাবে সংসদ পরিচালনার জন্য ধন্যবাদ জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘ধন্যবাদ মাননীয় স্পিকার, আমার দীর্ঘ বক্তব্যে কোনো ভুলত্রুটি হলে আমাকে ক্ষমা করবেন। প্রিয় দেশ এগিয়ে যাক। বৈষম্যহীন বাংলাদেশকে নিয়ে আমরা সবাই একসঙ্গে এগিয়ে যাই। যুবকদের স্বপ্নের বাংলাদেশ উপহার দিই এবং আমরা অতীতের গ্লানি থেকে বের হয়ে আসি।’