বিশেষ
প্রতিবেদন, আব্দুল কাইয়ুম খান
প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে দুর্নীতি: আস্থার সংকটে নাগরিক সমাজ
বাংলাদেশ
বর্তমানে মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায়
স্থান করে নেওয়ার পথে
দ্রুত এগিয়ে চললেও, এই দৃশ্যমান উন্নয়নের
সমান্তরালে দেশজুড়ে দুর্নীতি এক চরম ও
ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি আর কোনো বিচ্ছিন্ন
অনিয়ম বা একক ঘটনা
নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয়
ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে একটি শক্তিশালী ‘সিস্টেম’
বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।
আন্তর্জাতিক
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সর্বশেষ প্রকাশিত
তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রধান ১০টি নাগরিক সেবা
খাতের মধ্যে অন্তত ৮টি খাতেই সাধারণ
মানুষের দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার ৬০ শতাংশের
চেয়েও অনেক বেশি। প্রাতিষ্ঠানিক
এই দুর্নীতির প্রত্যক্ষ প্রভাবে প্রতি বছর রাষ্ট্র হাজার
হাজার কোটি টাকার বিশাল
রাজস্ব হারাচ্ছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয়
প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ নাগরিকদের আস্থা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ
ভেঙে পড়ছে। দেশের বিচার বিভাগ, ভূমি প্রশাসন, পুলিশ
বাহিনী এবং স্বাস্থ্য খাতের
পরেই নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে বড়
ভোগান্তি ও হয়রানির জায়গা
হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে গণপরিবহন সেবা খাত।
সেবা
খাতে দুর্নীতি নিয়ে টিআইবি’র
সর্বশেষ খাতভিত্তিক জরিপে একটি অত্যন্ত ভয়াবহ
ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। দেশের
সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সেবা খাতের তালিকায়
দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি
(বিআরটিএ)।
এর
অর্থ হলো, একজন সাধারণ
নাগরিককে ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি করা থেকে
শুরু করে নিজের গাড়ির
অতি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নবায়ন করা—প্রতিটি ধাপে
ধাপে সরকারি সেবার পরিবর্তে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ঘুষ দিতে হচ্ছে।
টিআইবি’র এই জরিপে
অংশ নেওয়া সেবাগ্রহীতাদের একটি বিশাল অংশ
অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানিয়েছেন যে,
নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত
টাকা বা ‘স্পিড মানি’
দেওয়া ছাড়া তাদের কোনো
কাজই সম্পন্ন হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, টিআইবি’র
এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্টটি কেবল কোনো গাণিতিক
সংখ্যা নয়; বরং এটি
দেশের ১৮ কোটি মানুষের
দৈনন্দিন ভোগান্তি, হয়রানি ও শোষণের এক
জীবন্ত দলিল।
অনুসন্ধানে
দেখা গেছে, বিআরটিএ-কে একটি উন্মুক্ত
ঘুষের বাজারে পরিণত করার পেছনে মূলত
৪টি সুনির্দিষ্ট খাত সবচেয়ে বেশি
ভূমিকা রাখছে:
ড্রাইভিং লাইসেন্স বাণিজ্য: একজন চালকের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য সরকার নির্ধারিত প্রকৃত ফি মাত্র ৫ হাজার ৪০ টাকা। অথচ বিআরটিএ-এর ভেতরের ও বাইরের একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে একজন গ্রাহককে লাইসেন্স হাতে পেতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। টাকার বিনিময়ে লিখিত, মৌখিক (ভাইভা) ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার নামে দেশজুড়ে চলছে এক প্রকাশ্য লাইসেন্স বাণিজ্য।
ফিটনেস
ও রেজিস্ট্রেশন সিন্ডিকেট: গাড়ির ফিটনেস সনদ এবং রেজিস্ট্রেশনের
ফাইলগুলো বিআরটিএ অফিসে ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রেখে গ্রাহকদের
কাছ থেকে নিয়ম করে
‘স্পিড মানি’ বা অতিরিক্ত অর্থ
আদায় করা হয়। অধিকাংশ
ক্ষেত্রে সরকারি রশিদ ছাড়াই এই
অতিরিক্ত টাকা লেনদেন হওয়ার
কারণে বিআরটিএ প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার
বিশাল রাষ্ট্রীয় রাজস্ব হারাচ্ছে।
রুট
পারমিট ও নাম ট্রান্সফার:
নিয়ম অনুযায়ী যে কাজটি সর্বোচ্চ
১৫ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা,
রুট পারমিট ও নাম ট্রান্সফারের
সেই কাজ সম্পন্ন হতে
গ্রাহকদের মাসের পর মাস (প্রায়
৩-৪ মাস) অপেক্ষা
করতে হয়। ফাইলের গতি
সচল রাখতে গ্রাহকদের বাধ্য হয়ে দালাল ধরতে
হয়; অন্যথায় বিআরটিএ অফিস থেকে মূল
ফাইলটিই রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যায়।
দালালনির্ভর
পুরো শিক্ষানবিস সিস্টেম: দেশের প্রায় প্রতিটি বিআরটিএ অফিসের প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে
একদম ভেতরের মূল টেবিল পর্যন্ত
দালালদের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক
বা চক্র গড়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ
ও পরোক্ষ নীরব সমর্থন ছাড়া
এই ধরণের প্রকাশ্য দালাল রাজত্ব কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে
করেন ভুক্তভোগীরা।
চট্টগ্রাম
বিআরটিএ: সিন্ডিকেটের একক দৌরাত্ম্য ও আয়ের খনি
সারাদেশের
বিআরটিএ কার্যালয়গুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে অনিয়ন্ত্রিত ও ভয়াবহ অবস্থা
বিরাজ করছে চট্টগ্রাম বিআরটিএ-তে। সেখানে একটি
অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট
পুরো অফিস এবং সেবা
প্রক্রিয়াকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে জিম্মি করে রেখেছে বলে
শত শত ভুক্তভোগী গ্রাহক
সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছেন।
চট্টগ্রাম
বিআরটিএ-এর বিরুদ্ধে প্রধান
অভিযোগগুলো হলো—গ্রাহকদের হয়রানি
করার উদ্দেশ্যে ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে টেবিলে
আটকে রাখা, সিন্ডিকেটের চাহিদা অনুযায়ী ‘স্পিড মানি’ বা ঘুষ না
দিলে ড্রাইভিং টেস্টে পরীক্ষার্থীকে সরাসরি ফেল করিয়ে দেওয়া,
কোনো প্রকার সরকারি রশিদ বা প্রমাণ
ছাড়াই গ্রাহকদের কাছ থেকে লক্ষ
লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া
এবং বিআরটিএ অফিসের ভেতরেই দালালদের অবাধ যাতায়াতের জন্য
অলিখিত ‘স্পেশাল কাউন্টার’ বা বিশেষ ব্যবস্থার
উপস্থিতি। এর ফলে চট্টগ্রাম
বিআরটিএ এখন সাধারণ মানুষের
কাছে কোনো ‘সেবা প্রতিষ্ঠান’ নয়,
বরং সিন্ডিকেটের কোটি কোটি টাকা
‘আয়ের খনি’ হিসেবে কুখ্যাতি
লাভ করেছে।
বিআরটিএ-এর এই লাগামহীন
ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব কেবল বিআরটিএ অফিসের
চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর
সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের পুরো
সমাজ, অর্থনীতি ও সার্বিক নিরাপত্তার
ওপর:
অর্থনৈতিক
শোষণ: একজন সাধারণ সিএনজি
চালক কিংবা দরিদ্র রিকশা শ্রমিককে যখন একটি বৈধ
লাইসেন্সের জন্য সিন্ডিকেটকে ২০
থেকে ৩০ হাজার টাকা
দিতে হয়, যা মূলত
তার কয়েক মাসের মোট
আয়ের সমান; তখন এই চরম
অর্থনৈতিক শোষণের ফলে দরিদ্র মানুষগুলো
আরও বেশি দরিদ্র হয়ে
পড়ছে।
সড়ক
নিরাপত্তার চরম হুমকি: মেধা
ও দক্ষতার তোয়াক্কা না করে কেবল
বিপুল টাকার বিনিময়ে লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে হাজার
হাজার অদক্ষ ও সম্পূর্ণ অপ্রশিক্ষিত
চালক। এই অদক্ষ চালকদের
বেপরোয়া গাড়ি চালনার কারণে
দেশের সড়কগুলোতে প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে মর্মান্তিক
দুর্ঘটনা ও অকাল প্রাণহানি।
গত বছর দেশের সড়কগুলোতে
নিহত হওয়া ৭ হাজারেরও
বেশি মানুষের মৃত্যুর পেছনে বিআরটিএ-এর এই প্রাতিষ্ঠানিক
অনিয়ম ও লাইসেন্স বাণিজ্য
সরাসরি দায়ী।
রাষ্ট্রীয়
কোষাগারের ক্ষতি: বিআরটিএ-এর অভ্যন্তরে ব্যাপক
দুর্নীতি এবং কোটি কোটি
টাকার রাজস্ব ফাঁকির ফলে সরকার প্রতি
বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ থেকে বঞ্চিত
হচ্ছে, যা দেশের শিক্ষা,
জনস্বাস্থ্য ও মৌলিক অবকাঠামোগত
উন্নয়নে ব্যবহার করা সম্ভব হতো।
টেকসই
সমাধান ও সাধারণ নাগরিকদের মূল দাবি
বর্তমান
সরকার মুখে প্রতিনিয়ত ঘুষবিরোধী
অভিযান, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সড়ক পরিবহন
সংস্কারের (রোড ট্রান্সপোর্ট রিফর্ম)
কথা বললেও, অন্য দিকে টিআইবি’র রিপোর্টে বিআরটিএ-এর মতো অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত দুর্নীতিতে
দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। সরকারের এই প্রকাশ্য বৈপরীত্য
ও নীতিগত স্থবিরতা আর কোনোভাবেই চলতে
দেওয়া যায় না বলে
মনে করেন দেশের সচেতন
মহল। বিআরটিএ-কে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত
করতে সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে দ্রুত
৪টি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে:
১.
শতভাগ ডিজিটাল ও ফেসলেস সেবা:
দালালদের দৌরাত্ম্য ও সশরীরে যোগাযোগ
সম্পূর্ণ নির্মূল করতে লাইসেন্স ও
ফিটনেসের সকল আবেদন, পরীক্ষা
এবং ফি জমা দেওয়ার
পুরো প্রক্রিয়াটি বাধ্যতামূলকভাবে সম্পূর্ণ অনলাইনে বা ডিজিটাল মাধ্যমে
নিশ্চিত করতে হবে।
২.
সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া: চট্টগ্রাম
বিআরটিএ-সহ দেশের সকল
চিহ্নিত ও অভিযুক্ত আঞ্চলিক
অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এবং দালালদের বিরুদ্ধে
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মাধ্যমে সরাসরি
ও আকস্মিক এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
৩.
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: বিআরটিএ-এর সামগ্রিক কার্যক্রমে
পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত
করার লক্ষ্যে প্রতি মাসে সেবার বিবরণী,
দৈনিক কাজের তথ্য এবং মোট
আয়-ব্যয়ের হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।
৪.
কঠোর ফৌজদারি শাস্তি: কোনো কর্মকর্তা বা
কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ বা অনিয়মের
অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে কেবল
লোকদেখানো বদলি বা সাময়িক
বরখাস্ত নয়; বরং চাকরি
থেকে স্থায়ীভাবে চ্যুতি এবং কঠোর ফৌজদারি
আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির
মুখোমুখি করতে হবে।
একটি দেশের সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) যদি দুর্নীতিতে দ্বিতীয় শীর্ষ স্থান দখল করে থাকে, তবে সেই দেশের সড়কগুলোতে নাগরিকদের যাতায়াতের নিরাপত্তা কীভাবে প্রথম বা নিশ্চিত হতে পারে? দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার এবং সড়কে জীবনের নিরাপত্তা রক্ষা করতে হলে বিআরটিএ-এর আমূল সংস্কার ও শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা এখন অত্যন্ত জরুরি ও একটি জাতীয় সময়ের দাবি। দেশের সচেতন সমাজ এখন এক সুরে বলছে—আমরা বিআরটিএ-এর জবাবদিহিতা চাই এবং একটি সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই।
আকাশজমিন / আরআর