বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাটি দিন দিন আরও বেশি জটিল ও রহস্যে ঘেরা হয়ে উঠছে। এই চাঞ্চল্যকর মৃত্যুর ঘটনায় নিহতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ঘটনার রাতে সঙ্গে থাকা ‘বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে মারাত্মক অসংগতি ও এলোমেলো তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফলে পুরো ঘটনাটি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা মেট্রো উত্তর শাখা।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানিয়েছেন যে, ঘটনার রাতে তাঁরা দুজন তুরাগ নদের তীরবর্তী ওই নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় হঠাৎ করে কিছু অজ্ঞাতপরিচয় লোক তাঁদের ধাওয়া করে। এই আকস্মিক ধাওয়া খেয়ে আত্মরক্ষার্থে সাবেক বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং ভয়ে তিনি নিজে সেখান থেকে দ্রুত পালিয়ে আসেন।
দীপের দেওয়া এই তথ্যের ভিত্তিতে ও তাঁর দেখানো নির্দেশ অনুযায়ী বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পিবিআই। রাজধানীর তুরাগ নদের যে রাজবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সৌরির (২৮) মরদেহ ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল, ঠিক তার কাছাকাছি এলাকা থেকেই বাইকটি উদ্ধার করা হয়। পিবিআই সূত্র জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে টঙ্গীর মাজার বস্তি সংলগ্ন এলাকা থেকে মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয়। উদ্ধারকৃত এই বাইকটি তাহসিফের কি না, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো আইনগত ও প্রযুক্তিগত যাচাই-বাছাই চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে যে, এই মোটরসাইকেলটি তাহসিফেরই ব্যবহারের ছিল।
এদিকে পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্ধু দীপ শুরু থেকেই এই মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে অত্যন্ত ‘এলোমেলো’ ও পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশকে দেওয়া তাঁর সাম্প্রতিক জবানবন্দির সঙ্গে ঘটনার আগের বক্তব্যের কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
রেকর্ড অনুযায়ী, আটকের পূর্বে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে দীপ দাবি করেছিলেন যে, ঘটনার রাতে তাঁরা একসঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া শেষ করার পর দুজন সম্পূর্ণ আলাদা পথে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যান। কিন্তু পরবর্তীতে পিবিআইয়ের নিবিড় ও কঠোর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলেন। তিনি স্বীকার করেন যে, তাঁরা ঘটনাস্থলে একসঙ্গে ছিলেন এবং ধাওয়া খাওয়ার পর তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। বক্তব্য বারবার বদলানোর কারণে তাঁর ওপর সন্দেহ আরও বাড়ছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আটক দীপের দেওয়া প্রথম দিকের বক্তব্য এবং বর্তমান জিজ্ঞাসাবাদের প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক রয়েছে। তাঁর এই অসংলগ্ন বক্তব্যসহ তদন্তে প্রাপ্ত অন্যান্য পারিপার্শ্বিক ও কারিগরি তথ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সত্য উদ্ঘাটনে কোনো ফাঁক রাখা হচ্ছে না।
উল্লেখ্য, নিহত তাহসিফ গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার নিজস্ব বাসা থেকে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন। ওই দিন দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তিনি নিজের মুঠোফোনে মাকে একটি ভয়েস মেসেজ বা বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সেই বার্তায় তিনি জানিয়েছিলেন যে তিনি দ্রুত বাসায় ফিরে আসছেন; কিন্তু এরপর আর তিনি ফেরেননি। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর পরদিন বুধবার বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
এর আগে তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগের মুহূর্তের একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাঁকে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নিহতের পরিবারের সদস্যরা সেই ভিডিও ফুটেজ দেখে ওই ব্যক্তিকে বন্ধু দীপ হিসেবে নিশ্চিত করেছিলেন। এখন দীপের রহস্যজনক আচরণ ও অসংলগ্ন বক্তব্যের জট খুললেই এই মৃত্যুর আসল রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছে পরিবার ও তদন্তকারীরা।