ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬,  ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু এইচএসসির ফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন শুরু ১ নভেম্বর কাল প্রকাশ হবে এইচএসসি রেজাল্ট, অনলাইনে জানবেন যেভাবে শনিবার বিক্ষোভ সামাল দিতে প্রস্তুত ফ্রান্সের ৭০ হাজার পুলিশ ভারতে ছয় আরোহীসহ হেলিকপ্টার নিখোঁজ, বিধ্বস্ত হওয়ার আশঙ্কা ঝুলে গেল ইসরায়েলের নির্বাচন: রাজনৈতিক সংকটের আড়ালে হাসছেন নেতানিয়াহু তাহসিফ হত্যা রহস্য: দীপের এলোমেলো বক্তব্যে ঘনীভূত হচ্ছে ধোঁয়াশা কলাবাগানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় চারজনকে আটক করল পুলিশ সাইকেলে ১৯১ দেশ ভ্রমণ: সোমেন দেবনাথের অনন্য কীর্তি নম্বরপ্লেটবিহীন বাইক উদ্ধার ও দীপের তথ্যে তাহসিফ মৃত্যুর তদন্তে নতুন মোড়

সাইকেলে ১৯১ দেশ ভ্রমণ: সোমেন দেবনাথের অনন্য কীর্তি


  • আপলোড সময় : শুক্রবার ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৪:৪০ পিএম

অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর একটিমাত্র সাধারণ সাইকেলকে সম্বল করে বিশ্বজয়ের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন এক বাঙালি যুবক। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা সোমেন দেবনাথ দীর্ঘ প্রায় দুই দশক বা ১৯ বছর ধরে সাইকেল চালিয়ে একে একে বিশ্বের ১৯১টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। এই দীর্ঘ ও বিরল অভিযাত্রায় কেবল দেশ দেখাই তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল না; বরং তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বজুড়ে মারাত্মক ব্যাধি এইচআইভি-এইডস সম্পর্কে মানুষের মাঝে সঠিক সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া এবং বিশ্ব দরবারে ভারতীয় সংস্কৃতির মহান ঐতিহ্য ও উদার ভাবমূর্তি তুলে ধরা। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে সোমেন নিজের দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা, পথের নানা ঘাত-প্রতিঘাত এবং এই অভাবনীয় যাত্রার পেছনের গভীর অনুপ্রেরণার কথা বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।


বিগত ১৯ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় সোমেন দেবনাথ সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে দুই লাখ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছেন। পৃথিবীর প্রায় সবকটি মহাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে তাঁকে প্রতিনিয়ত চরম অনিশ্চয়তা, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবুও কোনো বাধাই তাঁর এই মানবসেবামূলক মহান মিশনকে থামিয়ে দিতে পারেনি।


সোমেন জানান, ২০০৪ সালের ২৭ মে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর এই ঐতিহাসিক সাইকেল যাত্রা শুরু হয়। মূল আন্তর্জাতিক অভিযানে বের হওয়ার আগে তিনি নিজের দেশ ভারতের ২৮টি রাজ্য এবং ৫টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সফলভাবে সাইকেলে চড়ে ঘুরে দেখেন। এরপর দিল্লিতে গিয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ড. এ পি জে আবদুল কালাম এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের এক বিরল সুযোগ পান। পরবর্তীতে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির আন্তরিক সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক অভিযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচটি দেশের ভিসা, ৫০ হাজার রুপি এবং পাঁচটি বিশেষ পরিচয়পত্র পেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বভ্রমণে নামেন তিনি।


২০০৪ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে সোমেন এশিয়ার বাংলাদেশ, নেপাল, চীন, ভুটান, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ সম্পন্ন করেন। এরপর ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ইউরোপের ৪৮টি দেশ, পরবর্তীতে আফ্রিকার ৫৪টি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ১০টি দেশ ভ্রমণ করেন। ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে তিনি দক্ষিণ আমেরিকার ১৩টি দেশ পাড়ি দেন এবং ২০১৮ সালে ক্যারিবিয়ান অঞ্চল ও মধ্য আমেরিকা সফর করেন। ২০১৯ ও ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮টি অঙ্গরাজ্য এবং কানাডা ভ্রমণের পাশাপাশি রাশিয়াও ঘুরে দেখেন এই বিশ্বব্রাজক।


তবে এই সুদীর্ঘ ভ্রমণ পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। সোমেনের জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তটি আসে করোনাভাইরাস মহামারির বিশ্বব্যাপী তাণ্ডবের সময়। ওই সময় তিনি চীনে আটকা পড়েন এবং প্রাণঘাতী করোনায় আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেদিনের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, অসুস্থ অবস্থায় নিজেকে সুস্থ করার আশায় গরম পানি পান করতে গেলে অসাবধানতাবশত তাঁর পুরো মুখ মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। ফলে প্রায় সাত থেকে আট দিন ধরে তিনি মুখে কোনো খাবার গ্রহণ করতে পারেননি। তবে অদম্য মনোবল ও চিকিৎসায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠে তিনি পুনরায় নিজের পথচলা শুরু করেন এবং দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া হয়ে পুনরায় এশিয়ায় ফিরে আসেন।


মূলত ১৪ বছর বয়সেই এইচআইভি সংক্রান্ত একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা সোমেনকে চরমভাবে নাড়া দেয় এবং তিনি এই রোগটি সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন। আন্তর্জাতিক অভিযাত্রার মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে এই রোগের প্রকৃত তথ্য পৌঁছানো এবং সমাজ থেকে ভয় ও নেতিবাচক ধারণা দূর করার অঙ্গীকার নিয়ে নামেন। তাঁর এই রোমাঞ্চকর সিদ্ধান্তের পেছনে দুটি মূল অনুপ্রেরণা কাজ করেছিল—এক, স্বামী বিবেকানন্দের মহান চিন্তাধারা এবং দুই, ১৯২৬ থেকে ১৯৩৭ সালে সাইকেলে বিশ্বভ্রমণ করা বিমল মুখার্জির লেখা বিখ্যাত বই ‘দো চাক্কায় দুনিয়া’।


বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার সাইকেল চালানো সোমেন দেবনাথের কাছে এই সাইকেলটি কেবল যোগাযোগের কোনো যান্ত্রিক বাহন নয়, বরং বিশ্বমানবতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন ও নিজের জীবনের মূল বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার এক অনন্য মাধ্যম।


এ সম্পর্কিত আরো খবর