বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির (২৮) রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে নতুন এবং অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে। নিহতের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করতে তাঁর ‘বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই’ ও একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করেছে নৌ পুলিশ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। শুক্রবার দুপুর ১টার দিকে দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর হোন্ডা রোড এবং হাজী মাজার বস্তি সংলগ্ন বিশ্ব ইজতেমা মাঠের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট পরিদর্শন করা হয়।
এর আগে গত বুধবার বিকেলে রাজধানীর উত্তরখানের রাজবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করেছিল নৌ পুলিশ। পরবর্তীতে গতকাল শুক্রবার সকালে ঠিক ওই স্থানটির কাছাকাছি দূরত্বে অবস্থিত টঙ্গী সেনাকল্যাণ সংস্থার পাশেই হোন্ডা রোড এলাকা থেকে একটি পরিত্যক্ত মোটরসাইকেল উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মূলত এই হোন্ডা রোড এবং হাজী মাজার বস্তি সংলগ্ন ইজতেমার মাঠের ওই এলাকাতেই তাহসিফ ও দীপ মৃত্যুর আগের রাতে একত্রে এসেছিলেন বলে জানা যায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে বন্ধু দ্বীপ এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন যে, ঘটনার রাতে তাঁরা দুজনে যখন ওই নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন, ঠিক সে সময় হঠাৎ করে কিছু লোক এসে তাঁদের ওপর ধাওয়া করে। পরিস্থিতির বেগতিক দেখে আত্মরক্ষার্থে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং ভয়ে তিনি নিজে সেখান থেকে দ্রুত পালিয়ে আসেন। পিবিআইয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দ্বীপ দাবি করেছেন যে, পুলিশের পোশাক পরিহিত কিছু লোক তাঁদের ধাওয়া করেছিল।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পিবিআই কর্মকর্তারা প্রাথমিক মূল্যায়নে জানিয়েছেন যে, রাজাবাড়ী ঘাট ও এর আশপাশের পুরো এলাকাটি মূলত একটি চিহ্নিত মাদক স্পট হিসেবে কুখ্যাত। যারা সেদিন তাঁদের ধাওয়া করেছিল, তারা ওই এলাকার কুখ্যাত মাদক কারবারি বা কোনো অপরাধী চক্রের সদস্য হতে পারে। মাদক ব্যবসায়ীদের ধাওয়া খেয়ে বাঁচার জন্য তাহসিফ আতঙ্কে নদীতে ঝাঁপ দেন এবং পরবর্তীতে গভীর পানিতে তলিয়ে গিয়ে মারা যেতে পারেন বলে জোরালো ধারণা করা হচ্ছে। দীপ পুলিশকে আরও জানান, কিছু লোক ধাওয়া করার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা দুজন দুই দিকে আলাদা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং সাবেক বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা তাহসিফ দৌড়ে সোজা নদের দিকে চলে যান।
উল্লেখ্য, এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই ক্লু উদঘাটনে মাঠে নামে পিবিআই। চাঞ্চল্যকর এই মামলায় তথ্য ও সত্যতা অনুসন্ধানের জন্য গত বুধবার রাতেই দ্বীপকে পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তর শাখায় নিয়ে যাওয়া হয়। since তাঁরা দুজনে ঘটনার রাতে একসঙ্গে ছিলেন, তাই তাঁরা সেদিন ঠিক কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন এবং কার কার সংস্পর্শে এসেছিলেন—সেসব বিষয়ে দীপের দেওয়া সমস্ত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মূলত নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই তাকে নিজেদের হেফাজতে রেখেছে পিবিআই।
এদিকে ঘটনাস্থলের পাশ থেকে যে নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে, সেটিকে তাহসিফ বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ব্যবহার করা বাইক বলেই প্রাথমিক নিশ্চিত করেছে পিবিআই। তবে বাইকটিতে কোনো নম্বরপ্লেট না থাকায় এর প্রকৃত মালিকানা ও সুনির্দিষ্ট পরিচয় যাচাই করার প্রক্রিয়া চলছে। পিবিআইয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, গ্রেপ্তার বা হেফাজতে থাকা দীপের দেওয়া মৌখিক ও সুনির্দিষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই মূলত এই ঘটনাস্থল শনাক্ত করা এবং বাইকটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ গণমাধ্যমকে জানান, ‘দ্বীপ আমাদের কাছে দাবি করেছেন যে তাঁরা ঘটনাস্থলে কথা বলছিলেন, এমন সময় অজ্ঞাত কিছু লোক তাঁদের ধাওয়া করে। এরপর তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন আর দীপ পালিয়ে আসেন। তাঁর এই বক্তব্যসহ অন্যান্য সমস্ত পারিপার্শ্বিক তথ্য আমরা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছি।’
পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরও জানান, উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটিতে কোনো নম্বরপ্লেট ছিল না। সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা গেছে যে তাহসিফ যে বাইকটি চালিয়ে বের হয়েছিলেন, সেটিতেও কোনো নম্বরপ্লেট ছিল না। এটি তাঁরই বাইক কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও নিখুঁত যাচাই-বাছাই চলছে।
বর্তমানে পিবিআই এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় নিবিড়ভাবে ‘ছায়াতদন্ত’ চালিয়ে যাচ্ছে। মূল মামলাটি নৌ পুলিশ সরাসরি তদন্ত করছে। তবে ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে অন্যান্য সব ইউনিটকে সঙ্গে নিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছে পিবিআই। তদন্তের স্বার্থে প্রাপ্ত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রমাণাদি ইতিমধ্যেই মূল তদন্তকারী সংস্থা নৌ পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। -