মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে বিদেশি নারীদের দিয়ে পরিচালিত একটি সংঘবদ্ধ ও গোপন অনৈতিক ব্যবসায়ী চক্রের আস্তানা উন্মোচন করেছে দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে একজন বাংলাদেশি ও থাই নাগরিক দম্পতিসহ মোট ২৬ জনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে স্থানীয় একজন মালয়েশীয় ব্যক্তিও রয়েছেন, যিনি অনৈতিক এই প্রতিষ্ঠানের ‘ক্যাপ্টেন’ বা মূল পাহারাদার হিসেবে সার্বিক দায়িত্ব পালন করতেন বলে ধারণা করছেন অভিযান পরিচালনাকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
বুধবার রাতে কুয়ালালামপুরের অত্যন্ত ব্যস্ত এলাকা কুচাই লামা এবং জালান গেলুগরে একই সময়ে সমন্বিতভাবে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে তাদের সকলকেই আটক করা হয়। ওই দিন রাত ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে শুরু হওয়া এই সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেন পুত্রজায়ায় অবস্থিত মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের প্রধান কার্যালয়ের গোয়েন্দা ও বিশেষ অভিযান শাখার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মূলত প্রধান এই অভিযানের অন্তত দুই সপ্তাহ পূর্ব থেকেই সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিবিড় গোয়েন্দা নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ জোরদার করে রাখা হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমের নিকট দেওয়া এক বিশেষ লিখিত বিবৃতিতে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান জানান, বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে আটক করা ২৬ জন ব্যক্তির বয়স আনুমানিক ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে বিস্তারিত পরিচয় অনুযায়ী রয়েছেন একজন বাংলাদেশি পুরুষ, একজন থাইল্যান্ডের নাগরিক নারী, একজন স্থানীয় মালয়েশীয় পুরুষ, তিনজন মিয়ানমারের পুরুষ, তিনজন বাংলাদেশি নারী, ১৪ জন ইন্দোনেশীয় নারী, দুইজন ভিয়েতনামী নারী এবং একজন মিয়ানমারের নারী নাগরিক।
অভিযান পরবর্তী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে ইমিগ্রেশন বিভাগ সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পেরেছে যে, আটক হওয়া সকল বিদেশি নাগরিকের কারও কাছেই মালয়েশিয়ায় বসবাস কিংবা অবস্থান করার মতো বৈধ কোনো ভ্রমণ নথি, প্রয়োজনীয় পাসপোর্ট কিংবা উপযুক্ত ভিসা সংক্রান্ত কাগজপত্র ছিল না।
উদ্ধার অভিযানের সময় ওই সকল আস্তানা থেকে চারটি বাংলাদেশি পাসপোর্ট, একটি থাই পাসপোর্ট এবং একটি ইন্দোনেশীয় পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়। এর পাশাপাশি তল্লাশি চালিয়ে বেশ কয়েকটি মোবাইল ফোন, অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত কনডম এবং অনৈতিক বাণিজ্যিক আদান-প্রদান থেকে উপার্জিত ১ হাজার ২১৫ মালয়েশীয় রিঙ্গিত নগদ অর্থ প্রশাসনিক হেফাজতে জব্দ করা হয়েছে।
মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান আরও নিশ্চিত করে জানান, গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল যে, দুটি ভিন্ন আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনাকে মূলত রূপপ্রসাধন ও অনৈতিক উপায়ে বিদেশি নারীদের ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছিল। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে স্থানীয় ক্লাং ভ্যালি এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের লক্ষ্য বানিয়ে আবাসিক ওই স্থাপনাটিতে গ্রাহক আকৃষ্ট করার জোর তৎপরতা চালানো হতো বলে প্রশাসনিক তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তকারীদের গভীর অনুসন্ধানে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, অনৈতিক এই সিন্ডিকেটের মূলহোতা বা পরিচালকরা কর্মীদের স্বাধীন চলাচল অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতেন এবং সকল কর্মীর ব্যক্তিগত পাসপোর্ট নিজেদের দখলে গচ্ছিত রাখতেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে আবাসিক এলাকার ওই বিশেষ স্থাপনায় চরম গোপনীয়তায় সকল অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো।
অন্যদিকে বাণিজ্যিক স্থাপনাটির সার্বিক পরিচালনা কার্যক্রম তদারকি করতেন আটক হওয়া ওই স্থানীয় মালয়েশীয় নাগরিক। প্রাথমিক প্রশাসনিক ধারণামতে, তিনি ওই কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক ‘ক্যাপ্টেন’ হিসেবে নিরাপত্তা ও পরিচালনার দায়িত্ব সামলাতেন।
ইমিগ্রেশন বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সূত্রে আরও জানা গেছে, আবাসিক স্থাপনাটিতে গড়ে প্রতি ৬০ মিনিটের জন্য আগত গ্রাহকদের কাছ থেকে ২০০ রিঙ্গিত নেওয়া হতো। অন্যদিকে বাণিজ্যিক স্থাপনাটিতে প্রতি ৯০ মিনিটের সেশনের জন্য নির্ধারণ করা ছিল ২৬০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০০ রিঙ্গিত। তদন্তের নথিপত্রে উঠে এসেছে, চক্রটি গত প্রায় দুই মাস ধরে টানা এই গোপন ও অবৈধ অপরাধ কর্মকাণ্ড সাবলীলভাবে চালিয়ে আসছিল।
বর্তমানে আটক বিদেশি দম্পতি এবং ওই স্থানীয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন আইন ১৯৫৯/৬৩-এর ৫৬(১)(ডি) ধারায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রক্রিয়া চলমান। এছাড়া অন্যান্য আটক বিদেশি নাগরিকদের একই আইনের ৬(১)(সি) ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
অভিযুক্ত আটক সবাইকে পরবর্তী আনুষ্ঠানিক ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ার জন্য সরাসরি মূল ইমিগ্রেশন কার্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি এই পুরো তদন্তে তথ্য দিয়ে সহায়তার উদ্দেশ্যে আরও সাতজন স্থানীয় পুরুষকে অবিলম্বে ইমিগ্রেশন কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
বিবৃতির শেষাংশে মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান দৃঢ়তার সঙ্গে পুনব্যক্ত করেন, মালয়েশিয়ার জাতীয় আইন লঙ্ঘন করে পরিচালিত যেকোনো বেআইনি কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে দমন করতে ইমিগ্রেশন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। দেশের অভ্যন্তরীণ স্থায়িত্ব, সাধারণ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অক্ষুণ্ণ রাখতে যেকোনো অবৈধ অনৈতিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আগামীতে আরও জোরালো অভিযান জোরদার করা হবে।