ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২ কমলা হ্যারিসের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা, পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার রাজধানীতে সকালের বৃষ্টিতে সড়কে ভোগান্তি, ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যায় নিহত বেড়ে ৯৫; নিখোঁজ ৩৮৪


  • আপলোড সময় : বুধবার ২৬ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৯:১৮ পিএম

নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে পাহাড়ি ধস থেকে সৃষ্ট এক আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ট্র্যাজেডিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো কয়েক শ পর্যটকসহ বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যার ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) প্রকাশ পাওয়া বিভিন্ন স্থান থেকে ধারণ করা ভিডিওচিত্রে আকস্মিক এই বন্যার ভয়াবহ রূপ উন্মোচিত হয়েছে। বানের প্রবল স্রোতে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি, প্রধান সড়ক এবং একাধিক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঠিক একই সময়ে তিব্বতের গাইরং কাউন্টির একটি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রেও ভয়াবহ ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে বহু মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।


হিমালয় অঞ্চলের দুর্গম ও দুর্যোগপূর্ণ এই ঘটনার কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পরবর্তী প্রভাবে বরফধস বা হিমবাহের ধসের কারণেই এই আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট ও প্রকৃত কারণ উদঘাটনে আরও গভীর তদন্ত প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিআইএমওডির (ICIMOD) প্রতিনিধি চিয়াংগং ঝাং জানিয়েছেন, লেন্দে নদীতে বরফ ও পাথরের ধস থেকেই মূলত বন্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ধসের ফলে নদীপথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে উজানে আবারও নতুন করে বন্যার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড) জানিয়েছে, আকস্মিক এই বিপর্যয় ঘটার প্রায় সাত মিনিট আগে ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি রেকর্ড করা হয়েছিল।


নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দুর্গম ও বন্যাকবলিত অঞ্চলটি থেকে অন্তত ৩৮৪ জন পর্যটক ও ভ্রমণকারী নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ এই পর্যটকদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয়, ৯৩ জন নেপালি, ৩ জন মার্কিন এবং ১২ জন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার অন্তত ৮ জন নাগরিকেরও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় পর্যটকদের সঙ্গে সরাসরি কোনো যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না, যা উদ্ধার তৎপরতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।


নেপালের স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টার দিকে সীমান্ত এলাকার প্রবাহিত ভোটেকোশি নদীতে হঠাৎ করেই পানির প্রবাহ অস্বাভাবিক ও তীব্রভাবে বেড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই পানির সেই প্রলয়ংকারী স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যায় কয়েকটি গ্রাম। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ও একাধিক নির্মাণাধীন ও চালুকৃত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নেপালের এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, প্রবল বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যার পর নদী তীরবর্তী অঞ্চল থেকে এখন পর্যন্ত ২২টি মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পাহাড়ি জেলা রাসুয়ার সিয়াপ্রু বেসি ও তিমুরে এলাকায় নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্ধার কাজে নিয়োজিত হেলিকপ্টারগুলোও ঠিকমতো অবতরণ করতে পারছে না।


দুর্যোগকবলিত এলাকার স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকে পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, নদীর পাশের বেশ কয়েকটি বসতি পানির স্রোতে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং তাঁর নিজেরই পাঁচজন আত্মীয় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ভয়াবহ এই পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে রাসুয়া জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পরিয়ার নিচু এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে দেশের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রলয়ংকারী এই বন্যায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ বা ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, যা সার্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় চরম সংকট তৈরি করেছে।


অন্যপ্রান্তে চীনের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, বিশাল আকারের পাথর, কাদা ও পানির ভয়াবহ স্রোত ধেয়ে আসার সময় স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা প্রাণভয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। চীনের সরকারি সূত্রে জানা গেছে, নেপাল সীমান্তের কাছে শিগাতসে অঞ্চলের গাইরং বন্দরে ভূমিধসের কারণে স্থানীয় সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চীন সরকার ইতোমধ্যে ৫৭ ৪ জন বিশেষ উদ্ধারকারী সদস্যকে দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে পাঠিয়েছে। তবে পাহাড়ি রাস্তায় প্রায় পাঁচ ফুট গভীর কাদা ও পলি জমে থাকায় উদ্ধারকারী দলের যানবাহন ও যন্ত্রপাতি পৌঁছাতে তীব্র বেগ পেতে হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন এবং সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকাতে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন।


পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকাজ পরিচালনায় নেপাল সরকার ভারত ও চীনের কাছে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও উদ্ধার সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। সরকারের মুখপাত্র সস্মিত পোখরেল বলেন, প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে আটকা পড়া মানুষদের রক্ষায় প্রতিবেশীদের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন। অন্যদিকে নেপালের নদীগুলোর উদ্বৃত্ত পানি নিম্নাঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়ে ভারতে প্রবেশ করায় উত্তর প্রদেশ ও বিহার রাজ্যেও বন্যার সতর্কতা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। তিব্বত থেকে উৎপন্ন ভোতে কোশি নদী নেপালের ত্রিশূলী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পরবর্তীতে ভারতে গণ্ডক নদী নামে প্রবাহিত হয়। ভৌগোলিক এই কাঠামোর কারণে ভারতীয় সীমান্ত অঞ্চলেও পানি বৃদ্ধির ঝুঁকি বেড়েছে।


নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, দেশের সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী যৌথভাবে নিরবচ্ছিন্ন উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পাশাপাশি নদীর তীরবর্তী সমস্ত অধিবাসীদের সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালকে সব ধরনের মানবিক ও কারিগরি সহায়তার পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছেন এবং দুই দেশের উদ্ধারকর্মীরা সমন্বয়ের মাধ্যমে জোর উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন। উল্লেখ্য, এই অঞ্চলে এ ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবারই প্রথম নয়; গত বছরও তিব্বতের একটি হিমবাহসংলগ্ন হ্রদ ফেটে একই ভোতে কোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল, যেখানে ৯ জন নিহত ও ২৪ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন।


এ সম্পর্কিত আরো খবর