সরকারি
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে সরাসরি নিয়োগ পরীক্ষার অপেক্ষায় অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ হতাশার
মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন প্রায় সাত লাখ চাকরিপ্রার্থী। ১ হাজার ১২২টি
শূন্য পদের বিপরীতে তাঁরা আবেদন করেছিলেন গত বছরের আগস্ট
মাসে। দেখতে দেখতে একটি বছর অতিক্রম হয়ে গেলেও এখনো পরীক্ষার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি বা তারিখ ঘোষণা
করা হয়নি। সময়সূচি নির্ধারিত না হওয়ায় প্রস্তুতি
চালিয়ে গেলেও নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মারাত্মক অনিশ্চয়তায় পড়েছেন দেশের বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থী।
সরকারি
প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের তীব্র শূন্য পদ পূরণের উদ্দেশ্যে
২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট নতুন
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। প্রাথমিক বিজ্ঞপ্তিতে
পদসংখ্যা ছিল ২ হাজার ১৬৯টি।
তবে পরবর্তীতে প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন করা হয়। সংশোধিত বিধিমালার নতুন বিধান অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের মোট শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির
মাধ্যমে এবং বাকি ২০ শতাংশ সরাসরি
নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ফলে নতুন এই নিয়মের কারণে
সরাসরি নিয়োগের জন্য নির্ধারিত পদের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২২টিতে।
১ হাজার ১২২টি পদের বিপরীতে মোট আবেদন জমা পড়েছে প্রায় ৭ লাখ। সেই
হিসাবে প্রতিটি পদের জন্য গড়ে লড়বেন প্রায় ৬২৪ জন চাকরিপ্রার্থী, যা
এই নিয়োগ প্রতিযোগিতাকে চরম প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে।
বিজ্ঞপ্তি
প্রকাশের পর পিএসসি প্রাথমিক
প্রস্তুতি শুরু করলেও উচ্চ আদালতের একটি স্থগিতাদেশের কারণে গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে সেই আইনি জটিলতার অবসান হলে পুনরায় পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে এর মধ্যেই গত
১৮ আগস্ট পিএসসির তৎকালীন চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেমের আকস্মিক পদত্যাগের পর সাংবিধানিক এই
পদটি খালি হয়। ফলে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণের বিষয়টি আবারও নতুন করে ঝুলে পড়ে। অবশ্য পরবর্তীতে গত ২ সেপ্টেম্বর
পিএসসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভূঁইয়াকে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণ করায় খুব দ্রুতই নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাথমিক
ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন,
অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়োগ পরীক্ষা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও
উপাত্ত ইতোমধ্যে পিএসসিতে পাঠানো সম্পন্ন হয়েছে। এখন পিএসসি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ ও সুবিধা অনুযায়ী
পরীক্ষার চূড়ান্ত তারিখ ও সময়সূচি নির্ধারণ
করে তা প্রকাশ করবে।
পিএসসি
সূত্রে জানা গেছে, বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর জন্য পুরো পরীক্ষাটি ঢাকা কেন্দ্রের অধীনে নেওয়া একটি বিশাল প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
এক দিনে এত বড় পরিসরের
পরীক্ষা সম্পন্ন করা যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনই বিপুল ব্যয়ের বিষয়ও জড়িত। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায়
মোট ৯০ নম্বরের লিখিত
পরীক্ষা এবং ১০ নম্বরের মৌখিক
পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। লিখিত পরীক্ষায় পাস করতে হলে প্রার্থীদের অন্তত ৫০ শতাংশ নম্বর
পেতে হবে।
অন্যদিকে,
সরাসরি নিয়োগের মতো পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদ পূরণের প্রক্রিয়ায়
দীর্ঘ অপেক্ষা ও জট তৈরি
হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী ৮০ শতাংশ পদ
পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের কথা থাকলেও আইনি জটিলতায় টানা ১৩ বছর ধরে
পদোন্নতি প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। গত জুনে দেশের
সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক রায়ে সেই দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার অবসান ঘটে। এতে অভিজ্ঞ সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে উন্নীত হওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়।
কিন্তু রায়ের লিখিত সার্টিফাইড কপি এখনো প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে পৌঁছায়নি। ফলে প্রশাসনিক ও আইনি কার্যক্রম
শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিসংখ্যান
অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে অনুমোদিত ৬৫ হাজার ৪৫৭টি
প্রধান শিক্ষকের পদের মধ্যে ৩৪ হাজার ১৫৯টি
স্কুলেই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। বছরের পর বছর ধরে
এসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকেরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করে আসছেন। একদিকে সাত লাখ বেকার প্রার্থীর দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর, অন্যদিকে পদোন্নতিবঞ্চিত হাজার হাজার সহকারী শিক্ষকের অনিশ্চয়তা—উভয় মিলেই প্রাথমিক শিক্ষা খাতের এই সংকট দিন
দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।