অনলাইন রিপোর্টার
ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ কর্মসূচি পালন করে সরকারকে কঠোর বার্তা দিয়েছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। দাবিকৃত বিষয়গুলো দ্রুত পূরণ করা না হলে সরকার পতনের এক দফা কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে জোটটি। বিপরীতে ক্ষমতাসীন বিএনপি বলছে, রাজপথে আন্দোলন করার অধিকার বিরোধীদের থাকলেও উত্থাপিত দাবিগুলো আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব।
প্রথম দিনের লংমার্চে আয়োজিত পথসভাগুলোতে জোরালো বক্তব্য দেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং মিত্র দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। কুমিল্লায় আয়োজিত এক পথসভায় জনগণের উদ্দেশে জামায়াতের আমির বলেন, আগামীতে গুড় ও চিড়া-মুড়ি সঙ্গে নিয়ে ঢাকামুখী লংমার্চের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে জোটের অন্যতম মিত্র দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, তাদের অহিংস লংমার্চে বাধা দেওয়া হলে তারা ছয় দফা দাবি ছেড়ে সরাসরি সরকার পতনের এক দফা কর্মসূচির দিকে যেতে বাধ্য হবেন।
সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এ ধরনের বড় কর্মসূচির আয়োজন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। আন্দোলনের সার্বিক সময়োপযোগী যৌক্তিকতা কতটা এবং এই দাবিগুলো পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করা যেত কি না—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে বিরোধী দল সত্যিই কঠোর আন্দোলনের দিকে যাচ্ছে, নাকি স্রেফ বার্তা দিয়ে সরকারের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে, তা নিয়েও বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, বিরোধী দলের এই রাজপথের কর্মসূচিকে 'লংমার্চ' না বলে 'রোড মার্চ' বলা সুবিধাজনক। কারণ নির্দিষ্ট কিছু যানবাহন ও দলীয় নেতাকর্মীদের বাইরে সাধারণ জনগণের ব্যাপক সম্পৃক্ততা সেখানে দেখা যায়নি। বিশেষ করে সাবেক রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে বিএনপি ও জামায়াত পৃথক কোনো কৌশল অবলম্বন করছে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
তবে বিরোধী দলের দাবি, পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার পরও সরকার সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। বিপরীতে ক্ষমতাসীনদের অভিমত, যৌক্তিক কোনো দাবি মেনে নিতে তাদের কোনো আপত্তি নেই এবং জাতীয় সংসদে আলোচনার পথ উন্মুক্ত রয়েছে। ফলে রাজপথে এসে বিরোধীদের এমন আচরণ তাদের কাছে বোধগম্য নয়।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুহিন হোসেন প্রিন্স জানান, সরকারি দল ও বিরোধী দলের মৌলিক অর্থনৈতিক নীতিতে কোনো তফাত নেই। ফলে জনগণের একাংশ মনে করছে এসব অবস্থান ক্ষমতার ভাগাভাগির অংশ মাত্র। লংমার্চকে 'গাড়ি মার্চ' ও 'পিকনিক মুড' হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো অর্থনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া।
ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা। ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর, কুমিল্লার পদুয়া বাজার, ফেনীর মহীপাল ও চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে পথসভা শেষে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা, ২৪ অক্টোবর ঢাকা-সিলেট লংমার্চ এবং ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের কথা রয়েছে।
ফেনীর পথসভায় সময় বেঁধে দিয়ে বিরোধীদের শীর্ষ নেতারা জানান, জীবন বাজি রেখে চূড়ান্ত ডাকের জন্য জনগণকে প্রস্তুত থাকতে হবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না জানান, বিরোধীদের কর্মসূচি প্রিম্যাচিউর বা অপক্ব। এখনই জনগণ সরকার পতনের আন্দোলনের জন্য রাজপথে নামবে বলে তিনি মনে করেন না।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন দাবি করেন, সরকার শুরু থেকেই ব্যর্থ হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দামের কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ তোলেন।
এদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, সরকার বিরোধী দলের আন্দোলনকে গণতান্ত্রিকভাবেই দেখছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জাতীয় সংসদ সন্তোষজনকভাবে কার্যকর থাকা অবস্থায় রাজপথে লংমার্চ আয়োজন গণআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী।
বিকেলে খামারবাড়ীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, "স্বৈরাচার কি আবার গুপ্তদের মাঝে গুপ্ত হয়ে আছে? একজন আরেকজনকে আড়াল করার চেষ্টা করছে? তবে যেকোনো অরাজকতা সৃষ্টি করা হলে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু জানান, সরকার বিরোধীদের কাজে কোনো বাধা দিচ্ছে না। বৈশ্বিক ও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জ্বালানি সংকট রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে না এসে বাইরে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে যা কাম্য নয়।