আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও ক্রসফায়ার সংক্রান্ত বিতর্কিত বক্তব্য ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ার বাইরে শক্তি প্রয়োগের এমন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব। অপরাধ দমনে আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগের বদলে এ ধরনের শব্দচয়নকে দেশের সামাজিক ও আইনি স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
‘সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করা হবে’–পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের এমন বক্তব্য সরকারের জন্য চরম বিব্রতকর বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, যে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজপথে লড়াই করেছে, সেই দলের সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় স্বয়ং পুলিশপ্রধানের মুখে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দ শুনে তাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা কর্মসূচির (মেডিকেল ক্যাম্প) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রিজভী এসব কথা বলেন।
পুলিশ বাহিনীর প্রধানকে সরকারেরই একটি অংশ হিসেবে উল্লেখ করে রুহুল কবির রিজভী ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, ‘তিনি কীভাবে ক্রসফায়ারের মতো স্পর্শকাতর কথা বলেন?’ তবে আইজিপির বক্তব্য যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে বিষয়টিকে আলাদাভাবে দেখা যেতে পারে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর এই রাজনৈতিক উপদেষ্টা।
বিগত শাসনকালের কথা স্মরণ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘গত ১৭ বছর ধরে বিএনপি ক্রসফায়ার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজপথে রক্তক্ষরণ ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করেছে। সেই দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ও ত্যাগের পরিণতিতে আমরা ৫ আগস্ট এবং জুলাই আন্দোলন পেয়েছি। পরবর্তীতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সারা দেশের আপামর মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা হলো একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গঠন। এমন সার্বিক প্রত্যাশার মাঝে দাঁড়িয়ে পুলিশ বাহিনীর প্রধানের মুখে ক্রসফায়ারের মতো কথা আমাদের চিন্তিত ও ভাবিয়ে তুলছে।’
অপরাধ দমনে দেশে পর্যাপ্ত আইন ও বিধিমালা রয়েছে উল্লেখ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, প্রচলিত আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করার মূল দায়িত্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। আইনানুগ পথেই সমস্ত সন্ত্রাস ও অপরাধ দমন করা সম্ভব। পাশাপাশি কিশোর অপরাধের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং ঢাকার কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় অপরাধের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়া নিয়েও অনুষ্ঠানে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
রিজভী আরও বলেন, ‘পুলিশ বাহিনীতে অনেক সৎ, পেশাদার ও দক্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন; তাঁদের সততাকে সঠিক কাজে লাগাতে হবে। কোনো ধরনের অনৈতিক প্রভাব ছাড়াই আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হলে যেকোনো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। গুম কিংবা ক্রসফায়ার—কোনোটিই অপরাধ দমনের জন্য গ্রহণযোগ্য ও সভ্য পদ্ধতি হতে পারে না। সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কথা বলা ও কাজ করা উচিত। সস্তা কৃতিত্ব নেওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো বক্তব্য দেওয়া হলে তা দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তির জন্য চরম ক্ষতিকর হতে পারে।’
উল্লেখ্য, গত সোমবার পুরান ঢাকার চকবাজারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির প্রকাশ্যে বলেছিলেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে। তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ার পরপরই জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টিসহ দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলো এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা চরম প্রতিক্রিয়া ও তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করে। দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, আইজিপি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটির অবতারণা করেননি; বরং অপরাধীদের দমনে আইনি কঠোরতার বিষয়টি বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করেছেন।