ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে একটি উন্নত, নিবন্ধিত ও শৃঙ্খলিত ব্যবস্থার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অটোরিকশাচালকদের কর্মসংস্থান অক্ষুণ্ন রেখে ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দ্রুতই নতুন নীতিমালা ও বিধিমালা কার্যকর করা হচ্ছে। এই নীতিমালার অধীনে প্রতিটি অটোরিকশায় কিউআর কোড ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম যুক্ত করা হবে, যাতে একটি নম্বরের অধীনে অবৈধভাবে একাধিক রিকশা চালানোর কোনো সুযোগ না থাকে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ লেড-এসিড ব্যাটারি তুলে দিয়ে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক জোনিং ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু ৭১ বিধিতে মনোযোগ আকর্ষণীয় নোটিশ উত্থাপন করলে তার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব কথা জানান।
সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে চালু থাকা ৫০টি এআই নির্ভর ট্রাফিক ক্যামেরার সুফল এবং একই সঙ্গে অটোরিকশার কারণে তৈরি হওয়া বিভিন্ন বিশৃঙ্খলার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা চালুর পর সড়কে লাল বাতি অমান্য করা, লাইন পরিবর্তন কিংবা অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর মতো নিয়মভঙ্গ অনেকাংশেই কমে এসেছে। কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে। এসব যানের কোনো সুনির্দিষ্ট নম্বর প্লেট না থাকায় এআই ক্যামেরায় অনিয়ম শনাক্ত হলেও ডিজিটাল জরিমানা বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা শহরে বিপুল সংখ্যক অটোরিকশা অননুমোদিতভাবে প্রধান সড়কগুলোতেও ঢুকে পড়ছে। সঠিক কাঠামোগত নকশা না থাকায় প্রায়ই এসব বাহন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। তবে কম ভাড়া ও সহজলভ্যতার কারণে এটি সাধারণ মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তাই অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে কাঠামোগত পরিবর্তন, নম্বর প্লেট সংযোজন, চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান ও প্রশিক্ষণের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
নোটিশের বিপরীতে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজি বাইক ও তিন চাকার বৈদ্যুতিক যানগুলো গ্রামীণ ও নগর পরিবহন ব্যবস্থার একটি প্রধান অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে যেমন সাধারণ মানুষ উপকৃত হচ্ছে, তেমনি বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এর দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও রাজস্ব ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সারাদেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। বিপরীতে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই প্রায় ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট চলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে প্রতি বছর সরকারের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এসব রিকশায় ব্যবহৃত ক্ষতিকারক লেড-এসিড ব্যাটারি ও অনিরাপদ রিসাইক্লিংয়ের কারণে যে ধোঁয়া ও সিসা নির্গত হয়, তা বাতাস, মাটি ও পানি মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান টেনে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৬ হাজার ৭ ২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হন, যার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশেই যুক্ত ছিল অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।
বর্তমান আইনি পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রধান সড়কগুলোতে অটোরিকশা চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে নিয়মিত অভিযান ও ডাম্পিং পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযান চলছে। এছাড়া তেজগাঁও ও রমনা বিভাগে আরও ২০০টি এআই ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে, যা পর্যায়ক্রমে পুরো রাজধানীতে সম্প্রসারণ করা হবে।
পরবর্তীতে সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে নিশ্চিত করেন যে, সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান ও নীতিমালা এরই মধ্যে প্রণীত হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক চূড়ান্ত হওয়া এই নীতিমালায় রূপরেখা নিশ্চিত করা হয়েছে যাতে কোনো চালকের কর্মসংস্থান ব্যাহত না হয়। এতে কিউআর কোড, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। জাতীয় স্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে অতি দ্রুত এই নীতিমালার পূর্ণ প্রয়োগ ঘটানো হবে।