কূটনীতির পরিমণ্ডলে সাধারণত আলোচনার টেবিলই মূল আকর্ষণ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে গাড়ি বা ভ্রাম্যমাণ বৈঠকও কূটনৈতিক সম্পর্কের বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। এর সর্বশেষ ও চমৎকার এক উদাহরণ দেখা গেল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশের এই দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শেষে ১১ সদস্যের ব্রিকস সম্মেলন শুরুর ঠিক এক দিন আগে দুই শীর্ষ নেতা পুতিনের বিশেষ সাঁজোয়া অরুস সেনাত লিমুজিনে চড়ে একই সঙ্গে যাত্রা করেন।
উল্লেখ্য, গত বছর চীনে আয়োজিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনের সময়ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একই গাড়িতে চড়েছিলেন। এবারও নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর্ব শেষ করে দুই রাষ্ট্রনেতা রুশ প্রেসিডেন্টের বিলাসবহুল ও নিরাপদ লিমুজিনে চেপে সরাসরি ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত ‘ইন্নোপ্রম’ প্রদর্শনীতে গমন করেন।
‘ইন্নোপ্রম’ তথা ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সিবিশন হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ উৎপাদক ও ক্রেতারা একত্রিত হন। এটি বিশ্ববাজারে নতুন প্রযুক্তি প্রদর্শন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগের পথ সুগম করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর বিটুবি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
এই হাইপ্রোফাইল দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের এক স্মরণীয় মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে প্রাচীন তামিল কবি ও দার্শনিক তাঁতিসন্ত তিরুভাল্লুভারের রচিত বিখ্যাত ধর্মগ্রন্থ ‘তিরুক্কুরাল’-এর রুশ ভাষায় অনূদিত একটি কপি উপহার হিসেবে তুলে দেন। এই বিশেষ উপহার দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী মোদি পুতিনকে জানান, প্রায় দুই হাজার বছর আগে মহাত্মা তিরুভাল্লুভার তিরুক্কুরাল রচনা করেছিলেন। মানুষের জীবনচর্চা, নীতি ও সমাজব্যবস্থার পুরো বিষয়টি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে এই গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে এটি রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। মোদি আশা প্রকাশ করেন যে, তিরুক্কুরাল রুশ ভাষায় অনূদিত ও প্রচারিত হওয়ার ফলে দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও গভীর হবে, যা ভারত ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও বেশি শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
পরবর্তীকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিশেষ পোস্টে প্রধানমন্ত্রী মোদি লেখেন, প্রেসিডেন্ট পুতিনকে তিরুক্কুরালের রুশ অনুবাদ উপহার দিতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। মহান তিরুভাল্লুভারের চিরন্তন ও কালজয়ী জ্ঞান ভাষা এবং ভৌগোলিক সীমানার সমস্ত বাধা পেরিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেবে এই অনুবাদ।
কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে মস্কো সর্বদা নয়াদিল্লির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার ও প্রধান সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী হিসেবে বিবেচিত। শনিবারের ব্রিকস সম্মেলন যেখানে অনুষ্ঠিত হবে, সেই নয়াদিল্লির সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দেশের শীর্ষ নেতা যখন পৌঁছান, তখন সম্প্রচারমাধ্যমের ক্যামেরায় তাদের বেশ হাসিখুশি দেখা যায় এবং একে অপরের পিঠ চাপড়ে আন্তরিকতা প্রকাশ করতে দেখা যায়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠককালে ভারত-রাশিয়ার বিশেষ ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দুই নেতা উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, মহাকাশ গবেষণা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক বৃদ্ধি সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতার অগ্রগতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছেন। এসব খাত দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও রাশিয়ার পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও উল্লেখ করেছে, বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনীতির বিভিন্ন সাম্প্রতিক ঘটনাবলি, বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়া এবং কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ে দুই শীর্ষ নেতা গুরুত্বপূর্ণ মতামত বিনিময় করেন। আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী মোদি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো সংঘাত সমাধানের একমাত্র পথ হলো সংলাপ ও কূটনীতি। বিশ্বে শান্তি ও স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠার যেকোনো প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে ভারত সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি আবারও জানান।
ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে তিন দিনের সরকারি সফরে ভারতে অবস্থানরত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নয়াদিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক সম্পন্ন করেন। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ সৃষ্টি এবং জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। এর আগে গত ৩১ আগস্ট কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে ২৬তম সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকেও তাদের বৈঠক হয়েছিল। অর্থাৎ, দুই সপ্তাহেরও কম ব্যবধানে দুই বিশ্বনেতা আবারও বৈঠকে মিলিত হলেন। পুতিন এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভারত সফর করেছিলেন।
আকাশজমিন / আরআর