ফেনীর বহুল আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় উচ্চ আদালত থেকে খালাস পাওয়ার পর কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন আসামি কামরুন নাহার মনি। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কামরুন নাহার মনি এবং কারাগারে জন্ম নেওয়া তাঁর ৭ বছর বয়সী শিশুকন্যা রাথী একসঙ্গে কারাগারের মূল ফটক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। এর মাধ্যমে জীবনের শুরু থেকে কারাবন্দী থাকা শিশুটি দীর্ঘ সাত বছর পর প্রথমবারের মতো উন্মুক্ত আকাশ দেখার সুযোগ পেল।
২০১৯ সালে সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে নির্মমভাবে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার সময় কামরুন নাহার মনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরবর্তীতে এ মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘ কারাভোগের সময় কারাগারেই জন্ম হয় তাঁর কন্যাসন্তান রাথীর। জন্মের পর থেকেই নিষ্পাপ শিশুটিকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কাটাদে হয়েছে কারাগারের চার দেয়ালের অবরুদ্ধ পরিবেশে। ফলে বাইরের জগৎ বা মুক্ত পরিবেশ কেমন হয়, সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না। মঙ্গলবার উচ্চ আদালতের রায়ে মা খালাস পাওয়ার পর মায়ের সঙ্গে মুক্ত আকাশে পা রাখল এই শিশু।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সোনাগাজীর আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মোট ১৬ জন আসামির ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শেষে হাইকোর্ট ঐতিহাসিক রায় দেন। রায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ জনের মধ্যে ১০ জন আসামিকে সম্পূর্ণ খালাস দেওয়া হয় এবং চারজন আসামির মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। তবে এ জঘন্য হত্যাকাণ্ডের মূল দুই মাস্টারমাইন্ড ও প্রধান আসামি সিরাজ উদদৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট।
উচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ে যে ১০ জন আসামি খালাস পেয়েছেন তাঁরা হলেন—মাকসুদ আলম, রুহুল আমিন, কামরুন নাহার মনি, হাফেজ আব্দুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, আব্দুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা এবং আবছার উদ্দিন। অপরদিকে নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাঁদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে তাঁরা হলেন—নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের এবং উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।
আদালত ও মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাত জাহান রাফির শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় নুসরাতের পরিবার বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে অধ্যক্ষের অনুসারী ও সহযোগীরা নুসরাতকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও চাপ দিতে থাকে।
মামলা তুলে নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সকালে পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে কৌশল অবলম্বন করে নুসরাতকে মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হাত-পা বেঁধে তাঁর শরীরে কেরোসিন ঢেলে নির্মমভাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। শরীরের অধিকাংশ অংশ মারাত্মকভাবে দগ্ধ অবস্থায় নুসরাতকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল ও পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধীনস্থ শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে দীর্ঘ চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ১০ এপ্রিল নুসরাত মৃত্যুবরণ করেন।
নুসরাতের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর তাঁর বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন, যা পরবর্তীতে সরাসরি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থা দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে আপিলের মাধ্যমে পুনর্নিরীক্ষিত হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে কামরুন নাহার মনি মুক্ত হওয়ায় তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সাত বছর ধরে বন্দিজীবন কাটানো শিশু রাথীর মুক্ত আকাশ দেখার ঘটনাটি বিশেষ আবেগের সৃষ্টি করেছে।