আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং অন্যান্য দণ্ডাদেশের ওপর গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিরা বর্তমানে কে কোথায় অবস্থান করছেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, আসামিদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে এই মুহূর্তে প্রসিকিউশনের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, আসামিরা যেহেতু এখন আদালতের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী, তাই আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া এবং গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় তাদের অবস্থান যদি শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তবে দ্রুত গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকরের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজ কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। প্রেস ব্রিফিংকালে মামলার সার্বিক বিষয় তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত নির্মম মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি কিছু কিছু মারাত্মক অভিযোগে আসামিদের আমৃত্যু কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আদালত এক যুগান্তকারী নির্দেশনায় পাঁচ আসামির যত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে, তার ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে সরাসরি বাজেয়াপ্ত করার স্পষ্ট আদেশ দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী এসব বাজেয়াপ্তকৃত সম্পদ জুলাই ফাউন্ডেশন বা সংবিধিবদ্ধ অন্য যে সংস্থা রয়েছে, তাদের মাধ্যমে অর্থ রূপান্তর করে জুলাই আন্দোলনে শহীদ হওয়া পরিবারের সদস্য এবং গুরুতর আহত ব্যক্তিদের পরিবারের মধ্যে বণ্টন করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম রায় সম্পর্কে আরও বলেন, এ মামলায় প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে পৃথকভাবে চারটি করে অভিযোগ আনা হয়েছিল। বিচারিক প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ আসামির বিরুদ্ধে আনীত এসব অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, এ রায়ে আমরা মহান পরম করুণাময়ের কাছে শুকরিয়া আদায় করছি এবং প্রসিকিউশন পক্ষ হিসেবে আমরা এই রায়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট।
আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, আসামিদের সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি অর্থাৎ উর্ধ্বতন প্রশাসনিক দায় এবং ব্যক্তিগত অপরাধমূলক দায়ের বিষয়টি যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণে ট্রাইব্যুনালে সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় বৈঠকে দেশব্যাপী কারফিউ জারি এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আর সেই বৈঠকের পরই তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সরাসরি শুট অ্যাট সাইট নির্দেশের পর থেকেই রাজপথে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে নিরীহ মানুষদের হত্যা করার নৃশংস ঘটনা ঘটে।
মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ মামলার পলাতক আসামিরা অনেকেই বিভিন্ন গণমাধ্যমের ফেসবুক পেজে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা মন্তব্য করছেন—সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সব বিচারকার্য তারা জানতেন এবং সে বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে বিচার চললেও তারা আদালতে উপস্থিত হয়ে আইনিভাবে বিচার মোকাবিলা করেননি।
এতে খুব পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে যে আসামিরা ইচ্ছাকৃতভাবেই বিচার এড়িয়ে পলাতক রয়েছেন। মূলত তারা অপরাধ করেছেন বলেই আদালতের কাঠগড়ায় না দাঁড়িয়ে পালিয়ে রয়েছেন। ফলে পলাতক অবস্থায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া তাদের যেকোনো বক্তব্য আইনগতভাবে মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া কোনো অপরাধী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে আদালতের বিচার থেকে পলাতক থাকেন, তাহলে প্রচলিত আইনে যেভাবে স্পষ্টভাবে বিধান রয়েছে সেভাবেই বিচারকার্য নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়েছে। অতএব এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো মানবাধিকার সংগঠনেরও মন্তব্যের ন্যূনতম অবকাশ নেই।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত সংক্রান্ত বিষয়ের আইনি ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ট্রাইব্যুনালের মূল রায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত দণ্ডপ্রাপ্তদের উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করার আইনি সময়সীমা থাকবে। সুতরাং ৩০ দিন পর্যন্ত আসামিদের কোনো সম্পদ সরাসরি বাজেয়াপ্ত বা অন্য কোনো ব্যবস্থাপনায় হস্তান্তর করার হয়তো তাৎক্ষণিক সুযোগ নেই। তবে রায়ের ৩০ দিন পার হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই আদেশ ও রায় বাস্তবায়ন করতে আর কোনো আইনগত বা প্রশাসনিক বাধা থাকবে না।