আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সৌদি আরবের লোহিত সাগরের উপকূলীয় কৌশলগত প্রধান বন্দর ইয়ানবুতে তেল লোডিং কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। গত সপ্তাহে ইরান সমর্থিত একটি শক্তিশালী ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠী সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ তেল পাইপলাইনে ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালায়। এই পাইপলাইনের মাধ্যমেই দেশটির মূল ভূখণ্ড থেকে লোহিত সাগরের প্রধান বন্দরগুলোতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয় এবং সেখান থেকে ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে সমুদ্রপথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল লোড ও রপ্তানি করা হয়ে থাকে।
ড্রোন হামলার পর নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে পুরো পাইপলাইন নেটওয়ার্কটি বন্ধ করে দেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ। আর এই পাইপলাইন সঞ্চালন বন্ধ থাকার সরাসরি প্রভাবে ইয়ানবু বন্দরে তেল লোডিং প্রক্রিয়া পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘মিডেল ইস্ট আই’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনাকর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইয়ানবু বন্দরে তেল সরবরাহ বন্ধ হওয়াকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। সেই হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত আন্তর্জাতিক জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় ইরান। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বাভাবিক তেল সরবরাহের মূল রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের সংবেদনশীল ‘বাব এল-মান্দেব’ প্রণালি দিয়ে সমুদ্রে তেল রপ্তানির পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল সৌদি আরব। তবে বর্তমানে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে ড্রোন হামলা ও ইয়ানবু বন্দর স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সৌদির তেল রপ্তানির প্রধান দুটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথই কার্যত একসাথে বন্ধ হয়ে গেল।
এদিকে লোহিত সাগরের অন্যতম প্রধান এই বন্দরে তেল লোডিং বন্ধ থাকা এবং পাইপলাইন অচলাবস্থার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘মিডেল ইস্ট আই’-এর পক্ষ থেকে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বিশ্বের অন্যতম সর্ববৃহৎ তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘আরামকো’-র কাছে সার্বিক পরিস্থিতি জানতে চেয়ে প্রশ্ন করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ধরনের মন্তব্য বা উত্তর পাওয়া যায়নি। আরামকোর এই নীরবতায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে লোহিত সাগরের এক প্রান্তে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বাব এল-মান্দেব প্রণালি অবস্থিত এবং অন্য প্রান্তে মিসরের বিশ্ববিখ্যাত সুয়েজ খাল যুক্ত রয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা সূত্রে জানা গেছে, ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীরা গত সপ্তাহে লোহিত সাগরের তীরবর্তী কৌশলগত বন্দরনগরী ‘মোখা’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। মোখা দখলের পরপরই হুথিরা আনুষ্ঠানিকভাবে কড়া ঘোষণা দেয় যে, বাব এল-মান্দেব প্রণালি ব্যবহার করে সৌদি আরবের কোনো জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল করতে দেওয়া হবে না।
বর্তমানে সমুদ্রসীমায় আধিপত্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট সচল রাখার লক্ষ্যে মোখা বন্দরনগরী থেকে হুথি বিদ্রোহীদের হটিয়ে এলাকাটি মুক্ত করতে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান জোরদার করেছে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি সামরিক বাহিনী। ইয়েমেনের মোখায় অবস্থানরত বিদ্রোহী আস্তানাগুলো লক্ষ্য করে প্রতিদিন অনবরত বিমান হামলা চালাচ্ছে সৌদির যুদ্ধবিমানগুলো। সব মিলিয়ে লোহিত সাগর অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক সামরিক উত্তেজনা এখন চরম রূপ ধারণ করেছে।