রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন শেরেবাংলা নগর সংসদ সদস্য ভবন (ন্যাম ভবন) থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সাবেক জামায়াত সমর্থিত ও পরবর্তীতে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য জিএম নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত প্রায় সাতটা ৪০ মিনিটের দিকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে তেজগাঁও বিভাগের পুলিশ প্রশাসন। ভবনের একটি ফ্ল্যাটের জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে তরুণীর দেহ ঝুলতে দেখে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা থানায় সংবাদ দেন। খবর পেয়ে শেরেবাংলা নগর থানা-পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। রাজধানীর সংসদ সদস্য ভবনের মতো সুরক্ষিত আবাসন এলাকায় এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছড়িয়ে পড়ায় পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা ও বিবরণ তুলে ধরে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান জানান, ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে তরুণীর দেহ ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়। খবর পেয়ে পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত সেখানে পৌঁছায় এবং পুরো স্থানটি কর্ডন করে রাখে। তবে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং আলামত সুরক্ষার স্বার্থে পুলিশ সদস্যরা শুরুতেই রুমের ভেতরে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকেন।
পুলিশ কর্মকর্তা মো. ইবনে মিজান আরও উল্লেখ করেন, ঘটনার গভীরতা ও আইনি প্রক্রিয়ার সুবিধার্থে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ ফরেনসিক দলকে খবর দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ফরেনসিক টিমের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছানোর পর তাঁদের উপস্থিতিতেই পুলিশের টিম রুমের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করবে এবং আলামত সংগ্রহ করবে। তবে এই রহস্যজনক ঘটনাটি ঠিক কখন বা কীভাবে ঘটেছিল, সে বিষয়ে এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, চলতি বছরের গত জুলাই মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোছা. মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ কয়েকটি ঘনিষ্ঠ ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার বিষয়টি জনসমক্ষে এলে সংসদ সদস্যের নৈতিকতা নিয়ে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে।
উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতে গত ২২ জুলাই সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দলীয় শৃঙ্খলভঙ্গ ও নীতিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করা হয়। দলটির অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক তদন্তে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুসরণ করে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং লিখিতভাবে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকেও অবহিত করা হয়। সে সময় বিষয়টি ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ঘটনা বলেও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।
রাজধানীর সুরক্ষিত ন্যাম ভবনে সংসদ সদস্যের দ্বিতীয় স্ত্রীর এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। পুরো বিষয়টি একটি পরিকল্পিত ঘটনা নাকি আত্মহনন, তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পিবিআই ও সিআইডি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হবে। ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট এবং ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরেই তরুণীর মৃত্যুর আসল কারণ উদঘাটিত হবে বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বর্তমানে পুরো এলাকাটিতে কড়া পুলিশি নিরাপত্তা জারি রাখা হয়েছে এবং তদন্ত কাজ জোরকদমে চলছে।