দেশের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা ও সাংবিধানিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন সংসদে পেশ করা হবে। পরবর্তী সময়ে এই সুনির্দিষ্ট রিপোর্টের আলোকেই বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় ও সার্বিক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে বহুপ্রতীক্ষিত ১৮তম সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ।
রবিবার জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে বিশেষ কমিটির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশের প্রশাসনিক ও শাসনতান্ত্রিক সংস্কার দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিতে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি করে পর্যালোচনা বৈঠক আয়োজন করা হবে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে সকল রাজনৈতিক দল ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিশদ সংলাপ সম্পন্ন করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরির কাজ সমাপ্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এর পরপরই আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবিধান সংশোধনী বিল পেশ করার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
কমিটির পর্যালোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ঐতিহাসিক ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ স্বাক্ষরকারী মোট ২৬টি নিবন্ধিত ও প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলকে সরাসরি সংলাপে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আয়োজিত দ্বিতীয় বৈঠকে ১৫টি রাজনৈতিক দল তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে সরাসরি আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। এ ছাড়া আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) তাদের মতামত লিখিতভাবে জমা দিয়েছে এবং জাতীয় গণফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা পারিবারিক অসুস্থতার কারণ জানিয়ে শেষ মুহূর্তে সরাসরি আসতে না পারলেও টেলিফোনে কমিটির প্রস্তাবনার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশেষ কমিটির কোনো কার্যক্রমে অংশ নেয়নি।
সংবিধানের সার্বিক কাঠামোগত পরিবর্তনের পরিধি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেন যে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জেলা ও জনপ্রশাসন এবং সামগ্রিক পুলিশি ব্যবস্থার যুগোপযোগী ও মৌলিক সংস্কারে সরকার শতভাগ অঙ্গীকারাবদ্ধ। এই রূপান্তরের অংশ হিসেবে দেশের ঐতিহ্যগত বাজেটের সময়সূচি বা অর্থবছর পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে সুচারুরূপে সম্পন্ন করা এবং সরকারি অর্থ অপচয় রোধ করার উদ্দেশ্যে বর্তমান ‘জুলাই-জুন’ অর্থবছরের পরিবর্তে আগামীতে ‘১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ’ পর্যন্ত নতুন অর্থবছর নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। প্রশাসনিক এই সিদ্ধান্তটি সারা দেশে কার্যকর করতে হলে দেশের মূল সংবিধানে প্রয়োজনীয় অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ১০০ সদস্যের একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবিত রূপরেখা বিশদভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সংসদে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ গঠনের ব্যাপারে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে। প্রস্তাবিত এই উচ্চকক্ষটি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবে না; বরং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত আসনসংখ্যার আনুপাতিক হারের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট নাগরিক ও গুণীজনদের সমন্বয়ে গঠিত হবে। তবে আইন প্রণয়ন ও পর্যালোচনার অধিকার থাকলেও মূল সংবিধান সংশোধন করার কোনো একক বা বিশেষ ক্ষমতা এই উচ্চকক্ষের ওপর ন্যস্ত থাকবে না।
জুলাই সনদে কিছু দল কর্তৃক দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিশেষ কমিটির সভাপতি বলেন, যেসব সুনির্দিষ্ট বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পর্যবেক্ষণ বা ভিন্নমত ছিল, সে বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ে নিজেদের দলীয় নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট ও খোলাসাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। জনগণ সেই ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতির পক্ষে সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট দিয়েছে। তাই জনগণের সেই দেওয়া গণরায় ও অঙ্গীকারের ওপর পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই সমস্ত প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে।
একই সঙ্গে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার কারণে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন এড়াতে চাইছে বলে বাজারে চলা গুঞ্জনকে ভিত্তিহীন আখ্যা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণ অসত্য ও বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার। জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সরকার এবং দায়িত্বশীল দল হিসেবে আমরা তা অক্ষরে অক্ষরে ও নিষ্ঠার সঙ্গে বাস্তবায়ন করব।
সংবিধান সংশোধন ভবিষ্যতে উচ্চ আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জ বা আইনি জটিলতার মুখে পড়বে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিশেষ কোনো পৃথক সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে না হলে আদালতে চ্যালেঞ্জ হবে কিংবা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো কোনো অবস্থাতেই পরিবর্তন করা যাবে না—এমন ধারণা নীতিগতভাবে সঠিক নয়।
সংবিধান কোনো অপরিবর্তনশীল বা স্থবির দলিল নয়, বরং সময়ের সাথে সাথে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চাহিদা অনুযায়ী তা পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হয়। জনগণের স্পষ্ট গণরায় নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করলে এবং সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে তারা জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংবিধানের যেকোনো ধারা পরিমার্জন করার পূর্ণ অধিকার রাখে। বিশ্বের অনেক উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও বহুবার সংবিধান সংশোধিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বিরোধী দলগুলো সংসদে এসে এই ঐতিহাসিক বিলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবে।