ক্ষমতার পরিবর্তন হলে নতুন সরকার কর্তৃক পূর্ববর্তী প্রশাসনের সম্পাদিত আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করা কূটনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে দ্বিপক্ষীয় অঙ্গীকারগুলো দেশের সার্বিক জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে কি না, তা পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সরকার কর্তৃক এসব চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রেখে অনুকূল পরিবেশ গড়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তবে মূল প্রশ্ন হলো, এই পর্যালোচনা কি নিছক রাজনৈতিক বা দলীয় বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তথ্য-উপাত্ত ও অর্জিত ফলাফলের ভিত্তিতে দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষণে সব চুক্তির ধরণ বা আইনি বাধ্যবাধকতা এক হয় না। বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ক্রয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা চুক্তি কিংবা সমঝোতা স্মারকের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। কোনো চুক্তি বিগত সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত হয়েছে বলেই তা বাতিল বা সন্দেহের চোখে দেখা সমীচীন নয়; বরং চুক্তিটির বিষয়বস্তু এবং অর্জিত ফলাফলের ভিত্তিতেই তার প্রকৃত উপযোগিতা নির্ধারণ করা উচিত। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে।
২০১৫ সালের বাংলাদেশ-ভারত ঐতিহাসিক স্থলসীমান্ত চুক্তি ও ২০১১ সালের প্রটোকল ভারতের পার্লামেন্টে পাস হলে বিরোধী দলে থাকা সত্ত্বেও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং দলটির নীতি-নির্ধারকেরা সেটিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। যা ছিটমহলবাসীদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়েছিল। একইভাবে ২০১৪ সালে জাতিসংঘের সালিসি ট্রাইব্যুনালের রায়ে বঙ্গোপসাগরে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার নতুন সমুদ্র এলাকা অর্জন করেছিল, তাও নির্দিষ্ট কোনো দলের নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অর্জন।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মতো বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোতে সরাসরি আর্থিক হিসেব যুক্ত থাকায় সেখানে কঠোর নিরপেক্ষ পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানির ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের জন্য ২০১৭ সালে চুক্তি করা হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে যেখানে ভারতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে আনা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল ৯ টাকা ৫৭ পয়সা, সেখানে আদানির বিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিটে গড়ে দিতে হয়েছে ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা।
অতিরিক্ত মূল্য ও কর সুবিধা নিয়ে আইনি বিরোধের এক পর্যায়ে ২০২৫ সালের নভেম্বরে হাইকোর্ট আন্তর্জাতিক সালিসি প্রক্রিয়া স্থগিত করে একটি বিচার বিভাগীয় বা বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি গঠনের পথ উন্মুক্ত করে। এর আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেও পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানান, আদানির চুক্তি পর্যবেক্ষণসহ ভারতের কাছ থেকে টাগবোট ক্রয়ের মতো প্রকল্প বাতিল বা সংশোধন করা হয়েছিল। এ জাতীয় আর্থিক মূল্যায়নের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত তথ্যের নির্ভুলতা, আর্থিক হিসাব এবং সঠিক দর-কষাকষি।
আঞ্চলিক যোগাযোগ বা কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক লাভ বিবেচনা করা প্রয়োজন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নৌ-প্রটোকলের অধীনে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৪৬ লাখ ৮০ হাজার টন পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশের জাতীয় আয় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে প্রতিবেশী দেশ সুবিধা পাচ্ছে কি না তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সেখান থেকে কতটা সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক লাভ পাচ্ছে।
পাশাপাশি ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি ঐতিহাসিক চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালেই শেষ হচ্ছে। ফলে এই চুক্তি নবায়ন কিংবা শর্তের নতুন রূপরেখা তৈরি এখন ঢাকার জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা। একই সঙ্গে তিস্তার অমীমাংসিত পানিবণ্টন সমস্যার যৌক্তিক সমাধানের দাবিও টেবিল থেকে সরছে না।
পররাষ্ট্রনীতির মূল সত্তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতার পর্যালোচনায় কোনো রাজনৈতিক প্রদর্শনী না রেখে প্রতিটি চুক্তির সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক শর্ত, আইনি বাধ্যবাধকতা, আর্থিক ক্ষতি এবং কৌশলগত সুবিধা নিরূপণ করতে হবে। ক্ষতিকর শর্ত থাকলে তা পরিবর্তন, জাতীয় স্বার্থের জন্য ভালো হলে তা বহাল এবং জটিলতা থাকলে তা পুনর্বিন্যাসের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই হবে এই পর্যালোচনার আসল সফলতা।