যুক্তরাষ্ট্রের আগামী ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যখন তীব্র ঝুঁকির মুখে, ঠিক সেই সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক একাধিক সিদ্ধান্ত ও আচার-আচরণ দেশজুড়ে নতুন করে প্রচণ্ড বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত ১২ দিনে গৃহীত একের পর এক খামখেয়ালি ও বিস্ময়কর পদক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মনে তাঁর দেশ পরিচালনার যোগ্যতা এবং মানসিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। ভোটারদের সরাসরি অর্থের প্রলোভন দেখানো, বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঙ্গরাজ্যগুলোতে দুর্যোগ সহায়তা বন্ধের হুমকি, দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ওপর অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞা জারি এবং প্রমাণহীন নানা দাবি তোলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মার্কিন রাজনীতির মাঠ এখন উত্তাল রূপ ধারণ করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর জনআস্থা কমে যাওয়ার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৬৭ শতাংশ সাধারণ নাগরিক বিশ্বাস করেন, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে ট্রাম্প তা প্রয়োজনীয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন না। একই সঙ্গে প্রায় ৭১ শতাংশ মানুষ তাঁর মেজাজ ও আচরণগত ভারসাম্য নিয়ে গভীর সংশয় ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এছাড়া ফক্স নিউজ ও সিএনএনের যৌথ পরিচালিত একটি জরিপে উঠে এসেছে, দেশের ৭০ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ও নিবন্ধিত ভোটার মনে করেন ইরান যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রেসিডেন্টের নির্দিষ্ট বা স্পষ্ট কোনো রূপরেখা নেই। মধ্যবর্তী নির্বাচনে পার্টির রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার পরিবর্তে তিনি উসকানিমূলক আচরণ বাড়িয়ে দিয়েছেন।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকলে দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫,০০০ ডলার দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছেন ট্রাম্প, যাকে নিবন্ধিত ভোটারদের অন্তত ৬৬ শতাংশ নাগরিক সম্পূর্ণ অনুচিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর পাশাপাশি উত্তর ক্যারোলিনায় ডেমোক্র্যাট সেনেটর নির্বাচিত করা হলে রাজ্যটিতে সরকারি দুর্যোগ তহবিল বরাদ্দ বন্ধের হুমকি দেন তিনি। যদিও পরবর্তীতে এটিকে নিছক কৌতুক হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে বিরোধী দল পরিচালিত রাজ্যগুলোর প্রতি ট্রাম্পের বৈষম্যমূলক মানসিকতার বিষয়টি পুনরায় সামনে এনেছে।
ইতিহাস পরিবর্তন ও তথ্য বিকৃতির প্রশ্নেও ডোনাল্ড ট্রাম্প নিত্যনতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছেন। নাইন-ইলেভেন হামলার বার্ষিকী পালনের ঠিক পূর্বে তিনি দাবি করেন, উদ্ধারকাজে নিয়োজিত অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা সে সময় তাঁকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছিলেন—যাকে মার্কিন গণমাধ্যম সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বীরত্ব ছিনতাইয়ের চেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালে পেনসিলভেনিয়ার বাটলারের নির্বাচনী জনসভায় তাঁর ওপর হওয়া প্রাণঘাতী হামলার পেছনের দায় কোনো প্রমাণ ছাড়াই তিনি ডেমোক্র্যাটদের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করেন।
অথচ মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের পরিচালক কাশ প্যাটেল আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষ্য দিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন, হামলায় অভিযুক্ত নিবন্ধিত রিপাবলিকান ঘাতক থমাস ক্রুকসের সঙ্গে অন্য কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য তাঁরা পাননি। অন্যদিকে অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রেও প্রেসিডেন্ট আজব ও অবাস্তব যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার না কমানো হলে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক ঘাটতি থাকা সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্র বছরে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার লাভবান হবে, যা প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি ও বিশ্ব অর্থনীতির মূল সূত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
নিজের স্বৈরাচারী মানসিকতার প্রদর্শন ঘটিয়ে ট্রাম্প হঠাৎ করেই হোয়াইট হাউসে প্রবেশের ক্ষেত্রে সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোর মতো প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর প্রবেশাধিকার নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এমনকি একজন সিএনএন সাংবাদিকের প্রেস পাস কেড়ে নেওয়া হয়, যা হোয়াইট হাউসের নিজস্ব কর্মকর্তা ও কর্মীদেরও হতবাক করে দিয়েছে। এর বাইরেও নিজের মনোনীত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের প্রকাশ্যে কড়া সমালোচনা করা, আমেরিকার দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত পররাষ্ট্রনীতি লঙ্ঘন করে আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সম্পর্কিত জননিরাপত্তার ঝুঁকিকে সম্পূর্ণ ভুয়া বলে উড়িয়ে দেওয়ার মতো খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
আইনি তোয়াক্কা না করে ঐতিহাসিক কেনেডি সেন্টারের নাম পরিবর্তন করে নিজের নাম বসানোর চাপ সৃষ্টি করছেন ট্রাম্প এবং তাঁর এই দাবি মেনে না নেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটির সরকারি তহবিল আটকে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন যখন সন্নিকটে, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ও খামখেয়ালি আচরণ রিপাবলিকান পার্টির জন্য এক বিরাট রাজনৈতিক বিপর্যয় ও ভোটারের অনাস্থা ডেকে আনতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সূত্র- সিএনএন