দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের ওপর যেকোনো ধরণের শারীরিক শাস্তি প্রদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সর্বোচ্চ শিক্ষাবোর্ড আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে বোর্ডের অধীনস্থ দেশের ছয়টি কওমি মাদ্রাসা বোর্ড এবং তাদের অধিভুক্ত প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনতিবিলম্বে ‘ছাত্র-ছাত্রী সুরক্ষা কমিটি’ গঠন ও তা কার্যকর করার কড়া নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
আল-হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল হাসান স্বাক্ষরিত এই বিশেষ নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের নৈতিকতার ভিত্তিতে গড়ে তোলা, তাদের সার্বিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা এবং মাদ্রাসা কেন্দ্রিক যেকোনো কুৎসা ও অপপ্রচার প্রতিরোধের বিষয়ে বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করা হয়েছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ওপর প্রহার এবং কতিপয় ব্যক্তির অনৈতিক আচরণের অভিযোগ প্রচারিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলো।
নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, শাসনের একমাত্র মূল উদ্দেশ্য হতে হবে শিক্ষার্থীর সংশোধন ও কল্যাণ; কোনোভাবেই ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা রাগ প্রকাশ করা যাবে না। সংশোধনের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়, প্রথমে নম্র সতর্কবার্তা ও মৃদু ভর্ৎসনা করা যেতে পারে। একান্ত জরুরি হলে চূড়ান্ত ধাপে অভিভাবককে লিখিতভাবে অবহিত করে তাদের উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে লাঠি, বেত বা অন্য কোনো বস্তুর সাহায্যে আঘাত করা, মুখমণ্ডল, মাথা বা শরীরের স্পর্শকাতর অংশে প্রহার এবং রক্তপাত বা দাগ সৃষ্টিকারী শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ বা ঘৃণাসূচক নামে ডাকা এবং যেকোনো মানসিক নির্যাতনকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আইন ভঙ্গকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে শরীয়ত ও প্রচলিত আইন উভয় বিধানমতে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলে জানানো হয়েছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আল-হাইআতুল উলয়ার স্থায়ী কমিটির ৬৯তম সভা এবং ২৯ জুলাই সাবকমিটির সভার সিদ্ধান্তের আলোকেই এই নির্দেশনা প্রণীত হয়। এটি তৈরিতে হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী ও শায়খুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভী সহ উলামায়ে দেওবন্দের শিক্ষা-তারবিয়ত বিষয়ক গবেষণা ও ফতোয়ার সাহায্য নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধানে প্রতিটি মাদ্রাসায় নিরপেক্ষ সুরক্ষা কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো নির্যাতন বা হয়রানির অভিযোগ পেশ হলে এই কমিটি সাত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে রিপোর্ট পেশ করবে। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি রাখতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানে এই কমিটি গঠন না করা হলে তাদের অধিভুক্তি বা ইলহাক বাতিল করা হবে। এছাড়াও সার্বিক তদারকির জন্য প্রতিটি বোর্ডে আলাদা মনিটরিং সেল ও হটলাইন চালু করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রয়োজনে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ০১৭০০-৭৬৩১৭৮-এ যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে।