বর্তমান সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের এক বিশাল ও যুগান্তকারী কর্মযজ্ঞ নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই অতীতের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মতো নাগরিক জীবনের অন্যতম প্রধান ভোগান্তি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে প্রশাসন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে একধরনের প্রচ্ছন্ন ভয় ও আতঙ্ক সঞ্চারিত হয়েছে, যাকে একটি ইতিবাচক প্রশাসনিক রূপান্তর হিসেবেই দেখছেন রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তবে সরকারের এসব দৃশ্যমান সাফল্য ও অগ্রগতির পরও রাষ্ট্রযন্ত্রের আমূল পরিবর্তনের পথে সবচেয়ে বড় এবং বিপজ্জনক প্রাতিষ্ঠানিক প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘদিনের শিকড় গড়া সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এবং ক্ষমতার বলয়ে থাকা তোষামোদকারী সুবিধাবাদী চক্র। প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়নে যে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি প্রয়োজন, সেখানে এই চাটুকার অপশক্তিগুলো প্রতিনিয়ত মারাত্মক অন্তরায় সৃষ্টি করে চলেছে।
সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় অর্থাৎ মন্ত্রিসভার দিকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তাকালে দেখা যায়, সেখানে বহু প্রবীণ, দেশপ্রেমিক, উচ্চশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যাদের ব্যক্তিগত সততা ও মেধা নিয়ে জনমনে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই একই সম্মানজনক নীতিনির্ধারণী পরিসরে এমন কিছু বিতর্কিত সদস্যও প্রবেশ করেছেন, যাদের মূল সক্ষমতা কাজের দক্ষতায় নয়, বরং তেলবাজি ও তোষামোদে। রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বিগত আমলে এক প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত চাটুকারিতার সঙ্গে বলেছিলেন, "আপনাকে দেখলে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে এবং আপনাকে পা ধরে সালাম করার খুব ইচ্ছা হয়।" পরবর্তীতে তিনি প্রকাশ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পা ধরে সালামও করেছিলেন। চরম বিস্ময়ের বিষয় হলো, অতীতে ক্ষমতার একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করে সুবিধা ভোগ করা এই তোষামোদকারী ও সুবিধাবাদী মুখগুলোই রূপ বদলে পুনরায় বর্তমান মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন কিংবা জায়গা করে নেওয়ার জন্য জোর রাজনৈতিক তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই ধরনের নীতিহীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির নিখুঁত ও বাস্তবধর্মী রূপরেখা ফুটে উঠেছিল প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বিখ্যাত "তেল" প্রবন্ধে। শাস্ত্রী মহাশয় শতবর্ষ আগেই অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উল্লেখ করে গেছেন যে, তেল এমন একটি অভাবনীয় ও শক্তিশালী অনুষঙ্গ যা সমাজের সর্বস্তরে সমানভাবে কার্যকর। যারা তেল দেওয়ার কৌশল আয়ত্ত করতে পেরেছে, তারা খুব ভালোভাবেই চেনে কাকে, কখন এবং কীভাবে তেল মেখে নিজের হীন স্বার্থ উদ্ধার করা সম্ভব। তাদের একমাত্র কাজই হলো সুবিধাজনক জায়গায় অবস্থান নিয়ে সুযোগমতো তেল মাখিয়ে নিজের আসন স্থায়ী করা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সেই চিরায়ত রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের এক নগ্ন ও দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবায়ন আজও রাষ্ট্রযন্ত্রের উচ্চপর্যায়ে স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে।
প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তোষামোদকারী চাটুকার শ্রেণিটি যে কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য যেকোনো প্রত্যক্ষ শত্রুর চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। কারণ তারা কখনোই রাষ্ট্রের অভিভাবক বা শীর্ষ নেতৃত্বকে দেশের সঠিক অবস্থা, জনগণের ক্ষোভ কিংবা সত্য তথ্য জানান না। বরং কেবল নিজেদের পদ-পদবি ও ব্যক্তিস্বার্থ টিকিয়ে রাখতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অন্ধভাবে তোষামোদ করে বিভ্রান্তিকর স্তুতিসূচক বক্তব্য দিতে থাকেন। জাতীয় সংসদে কিংবা নীতি নির্ধারণী বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ফোরামে তাদের প্রদত্ত বক্তব্য পর্যালোচনা করলে কোনো প্রশাসনিক প্রজ্ঞা, জাতীয় দূরদর্শিতা বা বিচক্ষণতার ছোঁয়া পাওয়া যায় না; বরং সেখানে দৃশ্যমান হয় কেবল ফাঁপা অলংকারনির্ভর কথা ও চাটুকারিতার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। অতীতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে যারা দলীয় ক্ষমতার ছায়ায় কিংবা হেভিওয়েট নেতাদের আত্মীয়-স্বজনের পরিচয় ভাঙিয়ে নিরাপদে সব ধরনের সুবিধা লুটে নিয়েছেন, তাদের মধ্যেই তোষামোদের এই প্রবণতা সবচেয়ে মারাত্মকভাবে দেখা যাচ্ছে। ফলে সরকারের মূল রূপান্তর ও সংস্কার এজেন্ডা ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক তোষামোদ ও চাটুকারিতার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনকে চরমভাবে অতিষ্ঠ ও বিষিয়ে তুলেছে তৃণমূল প্রশাসনিক দুর্নীতি। বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা ও ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাঠপর্যায়ের সরকারি সেবা খাতগুলোতে গেড়ে বসা এই ঘুস ও দুর্নীতির শক্তিশালী সিন্ডিকেট। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ভূমি কার্যালয়, সরকারি পাসপোর্ট অফিস, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বা বিআরটিএ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস কিংবা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার কার্যালয়গুলোর দিকে তাকালে এক চরম অব্যর্থতা ও প্রশাসনিক অবক্ষয়ের চিত্র ভেসে ওঠে। এসব সরকারি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে সরকার নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট ফি বা মাশুল থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত ঘুস প্রদান ছাড়া নাগরিক সুবিধা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়গুলোতে দেখা যায়, প্রতিটি জমির নামজারি বা মিউটেশনের জন্য ১০ থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেআইনি ঘুস আদায়ের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। মাঠপর্যায়ের একজন সাধারণ কর্মচারী বা কর্মকর্তা যদি ফাইল আটকে রেখে মাসে কয়েক হাজার আবেদনকারীর কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা আদায় করেন, তবে প্রতি মাসে তাঁর পকেটে জমে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা। একজন কর্মচারীর বৈধ আইনি আয়ের সঙ্গে কোনো ধরনের সঙ্গতি না থাকলেও, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এই অবৈধ টাকার পাহাড়ে ভর করে তারা রাজধানীঢাকার উত্তরা বা গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় আলিশান বাড়ি ও বিলাসবহুল আধুনিক ফ্ল্যাটের মালিক বনে যাচ্ছেন। একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারীর পক্ষে নিজের সততার আয়ে গুলশানে ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনা তো দূরের কথা, সেখানকার জীবনযাত্রার সাধারণ ব্যয় বহন করাই অসম্ভব। কিন্তু দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এই বিপুল কালো টাকা কেবল দেশের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং তা অবৈধ হুন্ডি কিংবা নানা জটিল উপায়ে বিদেশে পাচার করে উন্নত দেশগুলোতে গড়ে তোলা হচ্ছে সম্পদের পাহাড়।
অথচ বাংলাদেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর শাস্তির সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি তাঁর দাপ্তরিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোনো প্রকার অবৈধ ঘুস বা অর্থ গ্রহণ করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে নূন্যতম তিন বছরের কারাদণ্ডের আইনি বিধান রয়েছে। একইভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর ২৭ ধারায় অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি তাঁর প্রকাশ্য ও বৈধ আয়ের উৎসের সাথে সঙ্গতিহীন বা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদের মালিকানা অর্জন করেন, তবে তাঁকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে এবং তাঁর সেই সমস্ত অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্র বাজেয়াপ্ত করবে। এছাড়া মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুযায়ী দেশ থেকে অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করা হলে সেই পাচারকৃত সম্পদ উদ্ধারসহ বাজেয়াপ্ত করার কঠোর বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধিমালা ২০১৮ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুস কিংবা অসদাচরণের অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করার চূড়ান্ত প্রশাসনিক নিয়ম রয়েছে। আইনি বিধিমালার এই স্পষ্ট অবস্থান থাকা সত্ত্বেও যথাসময়ে উপযুক্ত প্রয়োগ ও কঠোর সদিচ্ছার অভাবে দুর্নীতির লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না।
এই চরম প্রশাসনিক অচলাবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও তোষামোদনির্ভর অবক্ষয় থেকে উত্তরণের জন্য অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রকে কিছু যুগান্তকারী ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, সরকার ও মন্ত্রিসভার নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে তোষামোদকারী ও সুবিধাবাদী মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রীদের দ্রুত চিহ্নিত করে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাটুকারিতা নয়, বরং মেধা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সততাকেই একমাত্র নিরপেক্ষ মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারকে প্রকৃতপক্ষে কঠোর ও দৃশ্যমান জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীল নীতি কার্যকর করতে হবে। এখানে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় প্রভাব বা আত্মীয়তার সম্পর্ক বিবেচনা করা চলবে না; অপরাধী ক্ষমতাসীন দলের লোক বা স্বজন হলেও তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার সুনিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। প্রতিটি ভূমি অফিস, বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বাধ্যতামূলকভাবে সম্পূর্ণ অনলাইন সেবা পদ্ধতি চালু, সর্বক্ষণ নজরদারির জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং গোপন অভিযোগ বাক্স চালু করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা বিভিন্ন অফিসে আকস্মিক ছদ্মবেশী অভিযান পরিচালনা করতে পারে এবং দুর্নীতিবাজদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের অধীনে এনে সংক্ষিপ্ত সময়ে সাজা প্রদান করতে পারে। পঞ্চমত, সন্দেহভাজন কর্মকর্তা ও তোষামোদকারী রাজনীতিবিদের দেশে ও বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সব ধরনের সম্পত্তির সঠিক হিসাব নিয়ে পাচারকৃত সম্পদ রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার জোর আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, দিনমজুর, কৃষক ও মেহনতি জনতা আজ এক বুক নতুন আশা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি বাংলাদেশের সফল সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান, যার কারণে পুরো জাতির এক বিশাল অংশের গভীর আস্থা ও ভরসা তাঁর ওপর অর্পিত রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চরম সততা, নীতি-নৈতিকতা ও সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও কোষাগারের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও হিসাবদীপ্ত। দেশের সাধারণ মানুষের তীব্র আকুলতা ও প্রত্যাশা, রাজনৈতিক চাটুকারদের প্রভাব এবং প্রশাসনিক দুর্নীতিবাজদের অপতৎপরতার বিষবৃক্ষ সমূলে উৎপাটন করে তিনি একটি তোষামোদমুক্ত, সুশাসিত, ইনসাফভিত্তিক ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সমর্থ হবেন।
লেখক: আব্দুল কাইয়ুম খান, পরিচালক, দুর্নীতি বিরোধী অভিযান