খুলনায়
বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীরসংলগ্ন একটি মেসে খাবার চুরির অপবাদ দিয়ে এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে
নির্মমভাবে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। নিহত তরুণ নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন। গত শুক্রবার দিবাগত
রাতে সংঘটিত এই ঘটনায় তাঁকে
চারতলার ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছে নাকি তিনি বাধ্য হয়ে লাফ দিয়েছেন—তা নিয়ে তৈরি
হয়েছে গভীর ধোঁয়াশা। তুচ্ছ চুরির অভিযোগে একজন ছাত্রের ওপর এমন বর্বর মধ্যযুগীয় নির্যাতনে স্তম্ভিত স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহত শিক্ষার্থীর
স্বজনেরা।
ঘটনার
সূত্রপাত হয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে গল্লামারি হল রোড এলাকার
একটি চারতলা ভবনে। হালকা গোলাপি রঙের এই ভবনের পুরোটাই
ছাত্রদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যেখানে প্রতিটি তলায় আটটি করে কক্ষ রয়েছে। নিহত আজমুল এই ভবনের চারতলার
‘ডি-৮’ নম্বর কক্ষে
একাই থাকতেন। মেসের গৃহকর্মী ফাতেমা জানান, শুক্রবার রাতে তিনি শুধু তিনতলার নয়জন শিক্ষার্থীর ‘মিল সিস্টেমে’র জন্য লাউ
দিয়ে মাছ রান্না করেছিলেন। কিন্তু পরিবেশনের সময় খাবারে ঘাটতি দেখা দিলে শিক্ষার্থীরা ধরে নেন তা চুরি হয়েছে।
এরপরই তারা মেসের প্রতিটি কক্ষে তল্লাশি চালানো শুরু করেন।
পরিস্থিতি
দেখতে উপস্থিত কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার দিকে তিনতলার উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা নিচতলা থেকে চারতলা পর্যন্ত তল্লাশি চালান। একপর্যায়ে চারতলায় আজমুলের কক্ষের খাটের নিচে একটি প্লেটে অর্ধেক খাওয়া ভাত ও মাছের সন্ধান
মেলে। এরপরই ক্ষিপ্ত শিক্ষার্থীরা আজমুলের ওপর চড়থাপ্পড় ও বেধড়ক মারধর
শুরু করেন। প্রতিবেশীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের থামাতে পারেননি। খবর ছড়িয়ে পড়লে বাইরে থেকেও অনেকে এসে হামলায় যোগ দেন। পরবর্তীতে আজমুলকে চারতলার ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। ছাদে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতনের পাশাপাশি জিনিসপত্র ফেরতের দাবি তোলা হয় এবং আজমুলের বাবার কাছে ফোন দিয়ে টাকা দাবি করা হয়।
মারধরের
একপর্যায়ে রাত দেড়টার দিকে আজমুল চারতলার ছাদ থেকে নিচে পড়ে যান। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে আজমুলকে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে নাকি নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি
লাফ দিয়েছেন, তা এখনো রহস্যে
ঘেরা।
নিহত
আজমুলের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার তিতুদহ ইউনিয়নের বড়শলুয়া গ্রামে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে শনিবার রাতে নিজ গ্রামে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। ঘটনার পর সরেজমিনে গিয়ে
দেখা যায়, চারতলা ভবনটির অধিকাংশ কক্ষই এখন তালাবদ্ধ। তৃতীয় ও চতুর্থ তলার
সব শিক্ষার্থী আতঙ্কে মেস ছেড়ে পালিয়েছেন। বাইরে পড়ে রয়েছে স্যান্ডেল ও জামাকাপড়। ভবনটির
মালিক সরোয়ার হোসেন হলেও এটি দেখাশোনা করতেন তাঁর জামাতা আকিবুর রহমান। মেস পরিচালনার দায়িত্বে থাকা গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রাক্তন শিক্ষার্থী মেহেদীও রুম বন্ধ করে মোবাইল ফোন বন্ধ করে রেখেছেন।
শিক্ষার্থীরা
জানান, এলাকায় প্রতিনিয়ত স্যান্ডেল, ল্যাপটপ ও ফোন চুরি
হলেও ভবনমালিক সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে কোনো উদ্যোগ নেননি।
নৃশংস
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের বাবা কুতুব উদ্দিন বাদী হয়ে নগরীর হরিণটানা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, মামলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন চার
শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫
জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত
সবাই পলাতক থাকায় রবিবার রাত পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।