কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দম্পতির ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম নির্মম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে চাঞ্চল্যকর নতুন মোড় এসেছে। আইফোন ও মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ধারের বিরোধের পাশাপাশি ঘটনাটিতে পূর্ব শত্রুতা কিংবা প্রতিশোধের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষ করে নিহত অপ্রতিমের মা সহকারী প্রক্টর থাকাকালে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পুলিশে দেওয়ার ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতি আয়োজিত এক মানববন্ধনে এসব তথ্য তুলে ধরেন বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা। তিনি জানান, অপ্রতিমের মা সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম যখন সহকারী প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলেন, তখন মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের বেশ কয়েকজন সদস্যকে আটক করে থানায় সোপর্দ করেছিলেন। অপ্রতিমকে হত্যার নেপথ্যে ওই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের কোনো চক্রান্ত বা প্রতিহিংসা লুকিয়ে আছে কি না, তা পুলিশকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।
এদিকে, এ ঘটনায় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার সকালে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়ার সময় পুলিশ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছুই জানত না। পরবর্তীতে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অপ্রতিমের নিথর দেহ উদ্ধারের খবর আসে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও গভীর রাতে সে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করে। তবে অন্য সহযোগীদের নাম প্রকাশে অপরাগতা প্রকাশ করে সে জানায়, সহযোগীদের পরিচয় গোপন রাখতে সে ‘ওয়াদাবদ্ধ’।
জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালে তুহিনের ব্যবহৃত মুঠোফোনে বারবার একাধিক নাম্বারের কল আসতে থাকে। সেই সূত্র ধরে পুলিশ অনুসন্ধানে নেমে অপ্রতিমের বাবার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান 'ইয়েসটেক'-এ কাজ করা এক কিশোরের সন্ধান পায়। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই কিশোরকে আটক করে। আটকের সময় তার পরনে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা একটি বিশেষ টি-শার্ট ছিল। পরে তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও একজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক কিশোরের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, অপ্রতিমের বাবার মোবাইল ফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির দোকান 'ইয়েসটেক'-এ মাত্র ১০ দিন আগে বিনা বেতনে কাজে যোগ দিয়েছিল সে। ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল। টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। পাওনা টাকার জন্য অপ্রতিম চাপ দিলে ক্ষুব্ধ হয়ে অপ্রতিমকে হত্যা করলে আর টাকা শোধ করতে হবে না—এমন ভাবনা থেকে চরম এই অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মোটিফ উদঘাটনে পুলিশ সব দিক বিবেচনায় রেখে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।