কুমিল্লা জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষে এবং উঠতি বয়সী অপরাধীদের দৌরাত্ম্য রুখতে একযোগে বিশাল অভিযান পরিচালনা করেছে আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী। জেলার মোট আঠারোটি থানায় একযোগে পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে সর্বমোট ছয়শত চব্বিশজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার সন্ধ্যার পর শুরু হওয়া এই সাঁড়াশি অভিযান চলে রাত দেড়টা পর্যন্ত। সাম্প্রতিক সময়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ কম বয়সী তরুণদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ মহলের নির্দেশে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামানের সরাসরি দিকনির্দেশনায় জেলার বিভিন্ন অপরাধপ্রবণ এলাকায় এই অভিযান চালানো হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটককৃতদের মধ্যে বিভিন্ন থানা এলাকার ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা রয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় পঁচাত্তর জন, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ছেচল্লিশ জন, বুড়িচং থানায় পঞ্চাশ জন, মনোহরগঞ্জ থানায় একচল্লিশ জন, দাউদকান্দি থানায় উনষাট জন এবং লাকসাম থানায় পঁয়ত্রিশ জনকে আটক করা হয়েছে। বাকি থানা এলাকাগুলো থেকেও আটকদের বিস্তারিত তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
এদিকে গত বুধবার রাত আটটা থেকেই কুমিল্লা কোতোয়ালি ও সদর দক্ষিণ মডেল থানাসহ বিভিন্ন থানার সামনে শত শত অভিভাবককে ভিড় করতে দেখা যায়। অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানদের আটকের খবর পেয়ে গভীর রাত পর্যন্ত থানার বাইরে উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করেন। অনেক অভিভাবক দাবি করেছেন, তাদের সন্তানরা সরাসরি কোনো গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং সাধারণ ঘোরাঘুরি বা আড্ডার সময় তাদের ধরে আনা হয়েছে। কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, আটকদের মধ্যে শিক্ষার্থীদের যাচাই করা হচ্ছে এবং সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ পেলে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হবে, আর অন্যদের মুচলেকা বা সতর্ক করে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হতে পারে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন করে চরম আকার ধারণ করেছে। গত শুক্রবার রাতে ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনার পর বিষয়টি তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৮ সেপ্টেম্বর কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ ইতোমধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে মূলহোতাসহ তিনজন আদালতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
এই হত্যাকাণ্ডের পরেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো দাবি ওঠে। অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লা শহরে অতীতেও বেশ কিছু কিশোর গ্যাং সক্রিয় ছিল এবং গত এক দশকে একাধিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কিশোরদের অপরাধ জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনতে এবং সমাজ থেকে এই ব্যাধি দূর করতে এ ধরনের বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে।