চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকলেও মুমূর্ষু রোগীকে উদ্ধারের বদলে চারপাশের উৎসুক জনতাকে মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। পরবর্তীতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই নারীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করেন।
গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাতে ব্যস্ততম কাপ্তাই সড়কের চন্দ্রঘোনা চারা বটতলা এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় লোকজনের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, দ্রুতগতির কোনো এক অজ্ঞাতনামা যানবাহনের ধাক্কায় ওই নারী রাস্তায় ছিটকে পড়ে মারাত্মকভাবে আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পরপরই ওই নারী রক্তাক্ত শরীরে সড়কের ওপর পড়ে ছটফট করছিলেন। কিন্তু লজ্জাজনকভাবে আশপাশের মানুষ সহায়তার হাত বাড়ানোর পরিবর্তে তাঁকে ঘিরে ধরে মুঠোফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মরিয়মনগর চৌমুহনী এলাকায় একটি রাজনৈতিক সভা শেষে নিজ গন্তব্যে ফেরার পথে ঘটনাটি দেখতে পেয়ে কয়েকজন সচেতন ব্যক্তি উদ্ধারে এগিয়ে আসেন।
উদ্ধার কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বিএনপি নেতা ইউসুফ সিকদার, উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব এস এম লোকমান, যুবদল নেতা মাসুদ পারভেজ ও ছাত্রদল নেতা শওকতসহ আরও বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। তাঁরা চরম মানবিকতার পরিচয় দিয়ে আহত নারীকে অবিলম্বে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
প্রাথমিক অবস্থায় আহত নারীর পরিচয় নিশ্চিত করা না গেলেও পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি ও দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবারের লোকজন তাঁকে চিনতে পারেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই নারীর নাম বীনা নাথ (৫০), তিনি সরফভাটা ইউনিয়নের নাথপাড়া গ্রামের সুভাষ নাথের স্ত্রী।
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বীনা নাথ মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিলেন এবং গত বুধবার বিকেল থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তাঁর ছেলে নয়ন নাথ জানান, সেদিন বিকেল তিনটার দিকে ধোপপুল এলাকার ভাড়া বাসা থেকে তাঁর মা হঠাৎ নিখোঁজ হন। এরপর থেকেই পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়স্বজনসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকেন।
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এক নারীর ছবি দেখতে পেয়ে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে শনাক্ত করতে সক্ষম হন। খবর পেয়ে তাঁরা দ্রুত রাঙ্গুনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছুটে যান এবং বীনা নাথকে দেখতে পান। পরবর্তীতে তাঁর অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
ঘটনার পর উদ্ধারকারীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সড়কে বা বিপদের মুখে কোনো আহত ও অসহায় মানুষকে পড়ে থাকতে দেখলে ছবি বা ভিডিও তোলার মতো অমানবিক কাজ না করে সকলের উচিত দ্রুত তাঁকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং চিকিৎসালয়ে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
এ বিষয়ে বিএনপি নেতা ইউসুফ সিকদার গণমাধ্যমকে জানান, সড়কে একজন আহত নারীকে এভাবে ছটফট করতে দেখে তাঁরা বিন্দুমাত্র দেরি না করে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তাঁর মতে, সড়কের দুর্ঘটনায় কোনো মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব; তামাশা দেখা বা ছবি তোলার চেয়ে অসুস্থ ব্যক্তির জীবন বাঁচানো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।