রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকার ঐতিহ্যবাহী রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বর্বরোচিত ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মী ডা. তাসনিম জারা। গত ৫০ বছর ধরে এলাকার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার আস্থার প্রতীক এই প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার পরও স্বাস্থ্যকর্মীরা যেভাবে খোলা আকাশের নিচে টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন, তার প্রশংসা করে তিনি দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
রোববার দুপুরে ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডা. তাসনিম জারা এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রসূতি মা, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কেন্দ্রটিতে ভয়াবহ তাণ্ডব চালানো হয়েছে। ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে ভাঙচুর চললেও পুলিশকে বারবার অবহিত করার পরও কেন তা প্রতিরোধ করা গেল না—সেই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ কীভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ভরসা রাখবে, তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই উল্লেখ করে ডা. জারা জানান, বর্তমান সময়ে সারা দেশেই বিভিন্ন ঘরানার জমি, বাড়ি ও দোকান দখলের বিস্তর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, যার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও বিএনপি নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠছে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর কেন হঠাৎ করে দখলদারিত্বের এমন প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, তা প্রশাসনকে গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা খাতের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, দুর্বৃত্তদের হামলায় শিশুদের টিকার রেজিস্টার খাতা, দুটি গুরুত্বপূর্ণ ট্যাব এবং অফিশিয়াল ফোন সেট খোয়া গেছে। আগে স্বাস্থ্যকর্মীরা রেজিস্টার দেখে অভিভাবকদের ফোন করে টিকাদানের নির্দিষ্ট সময় স্মরণ করিয়ে দিতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে যোগাযোগ রক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক অভিভাবক টিকার কার্ড হারিয়ে ফেললে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। এর ফলে ভবিষ্যতে শিশুদের মধ্যে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যেতে পারে। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে নতুন করে রেজিস্টার পুনর্গঠন ও শিশুদের টিকার ডেটা সংরক্ষণের জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
বর্তমানে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কারণে শিশুদের খোলা আকাশের নিচে রোদের মধ্যে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যার ফলে অনেক অভিভাবক দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বাধ্য হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে গর্ভবতী নারীদের আল্ট্রাসনোগ্রাফি, নিয়মিত চেকআপ এবং স্বাস্থ্য কাউন্সেলিংয়ের মতো অত্যাবশ্যকীয় সেবাগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। পরিদর্শনের সময় ভবনের কিছু কক্ষ এখনো ব্যবহার উপযোগী রয়েছে বলে জানান তিনি। প্রশাসন যদি দ্রুত ওই কক্ষগুলোর তালা খুলে দেয়, তবে অন্তত মাতৃস্বাস্থ্যসেবাগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ন্যূনতম কর্মপরিবেশ, যেমন ওয়াশরুম ও খাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান ডা. তাসনিম জারা।