ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,  ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ১ রান দূরে সাদমান, প্রথম দিনে বাংলাদেশের সংগ্রহ ২১৩ স্পেনে দ্রুতগতির দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত অন্তত ৪৬ দেশে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৯ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৯৮২ জাপানের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের উদাত্ত আহ্বান তারেক রহমানের বাউফলে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে কিন্ডারগার্টেন ও দুর্নীতির অভিযোগ ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচন ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে ইসি ইসরায়েলে নির্বাচন: ৬০ শতাংশ ভোট গণনা শেষ, এগিয়ে নেতানিয়াহুর দল খাদ্যে পুষ্টি উপাদান যুক্ত করতে দ্রুত আইন প্রণয়নের তাগিদ প্রতিমন্ত্রীর ক্রসফায়ার মন্তব্যে কোণঠাসা আইজিপি, আলোচনায় ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান রংপুরে দাঁড়িয়ে থাকা ডাম্প ট্রাকে বাসের ধাক্কা, নিহত বেড়ে ৪

নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ টাকা বেশি দিয়েও মিলছে না এলপি গ্যাস


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ৩:৪৩ পিএম

দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির কোনো ধরনের সংকট নেই বলে আমদানিকারক ও খাতসংশ্লিষ্ট অপারেটররা যতই দাবি করুন না কেন, সাধারণ ক্রেতাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ বিপরীত। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বর্তমানে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত চারশ থেকে পাঁচশ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। কোথাও কোথাও ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম দুই হাজার একশ টাকা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। পাইপলাইনের গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে রান্নার কাজে যারা সম্পূর্ণভাবে সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের এই চড়া দামে জ্বালানি কিনতে গিয়ে চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।


চলতি সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজির প্রতিটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৫৯৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি। গত দুই সেপ্টেম্বর আগের মাসের তুলনায় সিলিন্ডারের দাম তেরো টাকা কমানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও বাজারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকারি বা নির্ধারিত এই মূল্যে কোথাও সিলিন্ডার সরবরাহ মিলছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বা এনবিআর এর তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত আগস্ট মাসে দেশে মোট এক লাখ সাতান্ন হাজার সাতশ ষাট টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছিল। এমনকি চলতি সেপ্টেম্বরের বাইশে তারিখ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে এক লাখ আঠারো হাজার সাতশ বিরাশি টন। আমদানির এই পরিসংখ্যান পর্যাপ্ত মনে হলেও বাজারে তার বাস্তব কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।


এলপিজি খাতের ব্যবসায়ীরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে দাবি করেছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারের সরবরাহ শৃঙ্খল ও পরিবহন খাতে কিছু চাপ বিদ্যমান থাকলেও দেশে সামগ্রিক এলপিজির কোনো বড় সংকট নেই। তবে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ ঘাটতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আমদানিকারক জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপিজি কার্গো বা জাহাজ সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।


কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। এর পাশাপাশি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়া। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক বিদেশি সরবরাহকারী চুক্তি অনুযায়ী প্রতিশ্রুত পণ্যের মাত্র ষাট থেকে সত্তর শতাংশ সরবরাহ করছে, অর্থাৎ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কম পণ্য হাতে পাচ্ছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। খোলাবাজার থেকেও চাহিদামতো পর্যাপ্ত কার্গো সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে অনেক কোম্পানি তাদের বিদ্যমান সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রেশনিং পদ্ধতি অনুসরণ করতে বাধ্য হচ্ছে।


এছাড়াও এলপিজির মূল্য নির্ধারণের সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থা টনপ্রতি একশো ষাট ডলার প্রিমিয়াম ধরে হিসাব করলেও বর্তমানে তা আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে দুইশ ষাট থেকে চারশ ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। এই বর্ধিত ব্যয় কোনোভাবেই সমন্বয় করতে না পেরে অনেক আমদানিকারক বাধ্য হয়ে এলপিজি আমদানি উল্লেখযোগ্যহারে কমিয়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। একটি শীর্ষস্থানীয় এলপিজি কোম্পানির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো সময়মতো কার্গো বা জাহাজ না পাওয়া। দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে একই সঙ্গে জটিলতা তৈরি হওয়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণে এলপিজি কার্গো আমদানি করা যাচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও অনেকে তাদের চাহিদামতো পূর্ণাঙ্গ পণ্য হাতে পাচ্ছেন না। আরেকটি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, চলতি সেপ্টেম্বরে তাদের প্রায় ত্রিশ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে, যা গত আগস্ট মাসের তুলনামূলক পরিমাণে কম। উৎপাদক পর্যায়ে জ্বালানি সরবরাহের এই অনিশ্চয়তা পুরো খুচরা বাজারে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।


খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের পাল্টা অভিযোগ রয়েছে যে, শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি কোম্পানি তাদের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত সিলিন্ডার সরবরাহ করছে না, যার ফলে বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর দাবি, সরবরাহ হ্রাসের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অসাধু ডিলার, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতা গুদামজাত করে সিলিন্ডার মজুত করছেন এবং অতিরিক্ত মুনাফার লোভে চড়া দামে বিক্রি করছেন। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে বর্তমানে বারো কেজির সিলিন্ডার দুই হাজার থেকে দুই হাজার একশ টাকায় বিক্রি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।


এর অর্থ হলো, বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি সিলিন্ডারে গ্রাহককে পাঁচশ পনেরো টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরেও আমদানি হ্রাসের অজুহাতে ঠিক একই ধরনের সংকট তৈরি করা হয়েছিল, সে সময় কিছু এলাকায় বারো কেজির সিলিন্ডার তিন হাজার টাকা পর্যন্ত চড়া দামে বিক্রি হয়েছিল।


দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় পনেরো থেকে ষোলো লাখ টন এলপিজির বার্ষিক চাহিদা রয়েছে এবং প্রায় এক কোটি গ্রাহক এই রান্নার জ্বালানি ব্যবহার করে থাকেন। মোট ব্যবহারের প্রায় আশি শতাংশই গৃহস্থালির রান্নায় ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি যাতায়াত বা পরিবহন খাত এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানায়ও এলপিজির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। দেশের এই জ্বালানি বাজারের প্রায় নিরানব্বই শতাংশ সরবরাহ বেসরকারি খাতের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে থাকে।


এদিকে জ্বালানি বিভাগ সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। ওই সভায় অপারেটর ও উদ্যোক্তারা জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে আশ্বস্ত করে জানান যে, দেশে এলপিজির কোনো প্রকার ঘাটতি বা সংকট নেই। আমদানির সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরে উদ্যোক্তারা দাবি করেন যে দেশের বর্তমান জোগান এবং মজুত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। এ সময় জ্বালানিমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলেন যে, পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কোনো অবস্থাতেই যেন গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি না হয়, তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। অসৎ উদ্দেশ্যে কেউ যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন তিনি।



এ সম্পর্কিত আরো খবর