দেশের কারাগারগুলোতে বন্দিমৃত্যুর ঘটনা এক উদ্বেগজনক ও মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। গত প্রায় পৌনে ছয় বছরে (৫ বছর ৯ মাসে) কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ১ হাজার ২৩৫ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা গেছেন অন্তত ৩০০ জন কারাবন্দী। ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বন্দীর তীব্র চাপ, চিকিৎসকের চরম সংকট, অ্যাম্বুলেন্সের অপ্রতুলতা এবং সময়মতো উন্নত চিকিৎসার অভাবকে এই মর্মান্তিক অকালমৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
কারা অধিদপ্তর ও বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই ৫ বছর ৯ মাসে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১৮ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। তবে চলতি বছর (২০২৬) এই হার আরও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই (জানুয়ারি থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর) অন্তত ২৫১ জন বন্দী মারা গেছেন, যার মাসিক গড় দাঁড়ায় প্রায় ২৮ জনে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাত্র ৪০ মিনিটের ব্যবধানে দুই কারাবন্দীর মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এর আগে ২৩ সেপ্টেম্বর এবং সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন সময়েও পরপর বেশ কয়েকজন কারাবন্দীর অকালমৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে।
বর্তমানে দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দীর সংখ্যা ১ লাখ ৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, অথচ এসব কারাগারের মোট নির্ধারিত ধারণক্ষমতা মাত্র ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত ক্ষমতার প্রায় আড়াই গুণ বেশি বন্দীকে গাদাগাদি করে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও মানবেতর পরিবেশে বসবাস করতে হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ অসুস্থতা থেকে শুরু করে হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি ও লিভারের মতো মারাত্মক রোগগুলো আরও জটিল আকার ধারণ করছে। বন্দীদের স্বজনদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, কারাগারে বন্দীরা যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও ওষুধপত্র পান না। অনেক ক্ষেত্রেই যখন বন্দীর শারীরিক অবস্থা অতিসংকটজনক হয়ে ওঠে, কেবল তখনই তাঁদের বাইরে হাসপাতালে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা অনেক সময় দীর্ঘসূত্রিতা ও শহরের তীব্র যানজটের কারণে প্রাণঘাতী হয়ে দেখা দেয়।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫টি কারা হাসপাতালের জন্য ১৪৮টি চিকিৎসকের পদ অনুমোদিত থাকলেও বর্তমানে স্থায়ী চিকিৎসক আছেন মাত্র দুজন! বাকি পদগুলোতে সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে কিছু চিকিৎসককে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যারা প্রতিদিন মাত্র কয়েক ঘণ্টা কারা হাসপাতালে অবস্থান করেন। এর ফলে দুপুরের পর থেকে কোনো বন্দী হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। অন্যদিকে, ৭৫টি কারাগারের জন্য মোট অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২৭টি। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করার জন্য পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স বা জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন সুবিধাসম্পন্ন যানের তীব্র সংকট রয়েছে। বিশেষ করে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে রোগীদের ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে আনতে তীব্র ট্রাফিক জ্যামের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় হয়, যার ফলে পথেই অনেক বন্দীর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল এই সংকটের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন যে, বন্দীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ব্যবস্থাপনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কারা হাসপাতালগুলোতে লোকবল, চিকিৎসক, নার্স ও অ্যাম্বুলেন্সের তীব্র ঘাটতি দূর করতে না পারলে এই সংকট সমাধান করা কঠিন।
এদিকে বন্দীদের চিকিৎসাসেবা ও মানবাধিকার হরণের এই চিত্রকে ‘অপরাধমূলক অবহেলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। জাতিসংঘের ‘নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস’ বা বন্দীদের প্রতি আচরণের ন্যূনতম মানদণ্ড অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা প্রতিটি বন্দীর জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
প্রখ্যাত মানবাধিকারকর্মী মো. নুর খান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, গাদাগাদি পরিবেশ ও জরুরি চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে এ ধরনের বন্দী মৃত্যুর দায় রাষ্ট্র ও কারা কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। অতি দ্রুত কারাগারগুলোতে চিকিৎসকের স্থায়ী পদায়ন, কারা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বন্দীদের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।