রাজধানীর মিরপুর এলাকায় অবৈধ দখলদার ও হকার উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট নজিরবিহীন সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি সামাল দিয়ে কঠোর নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে আবারও উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুরের পর পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসলে পুনরায় এই উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করা হয়, যা নিয়ে পুরো মিরপুর এলাকায় এখনো থমথমে ও আতঙ্কিত অবস্থা বিরাজ করছে।
এর আগে বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বর এবং সংলগ্ন হোপ মার্কেট এলাকার ফুটপাত ও রাস্তা অবৈধ দখলমুক্ত করতে এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে নামে সিটি করপোরেশনের বুলডোজার ও পরিচ্ছন্নতা টিম। কিন্তু অভিযান চলাকালীন আকস্মিক এক কারিগরি ত্রুটির কারণে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। উচ্ছেদকাজের একপর্যায়ে একটি ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে শর্টসার্কিট থেকে হঠাৎ আগুনের স্ফুলিঙ্গ ও স্ফুরণের সৃষ্টি হয়। এই আকস্মিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত শত শত হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা সংঘবদ্ধ হয়ে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন।
উত্তেজনা চরম রূপ নিলে বিক্ষুব্ধ হকার ও আন্দোলনকারীরা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে চড়াও হয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। শুধু গাড়িতে অগ্নিসংযোগই নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও উচ্ছেদকাজে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতি বা ভেকু (এক্সক্যাভেটর) ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রের বাইরে চলে যাওয়ায় এবং সরকারি সম্পত্তিতে হামলার কারণে পুলিশ বাধ্য হয়ে দফায় দফায় টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। এতে মিরপুরের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা মুহূর্তের মধ্যে একপ্রকার রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় আশপাশের দোকানপাট ও শপিংমলগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপে ও ব্যাপক লাঠিচার্জের পর দুপুরের দিকে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আসে। পরবর্তীতে পরিবেশ পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার পর দুপুর সোয়া দুইটার দিকে পুলিশ, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী এবং প্রশাসনের কড়া পাহারায় হোপ মার্কেট ও এর আশপাশের স্থগিত থাকা উচ্ছেদ কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা হয়। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি কিংবা নতুন কোনো নাশকতা রোধ করতে পুরো মিরপুরজুড়ে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এলাকার স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে পুলিশের সাঁজোয়া যান ও টহল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এদিকে এই উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক মহলের উপস্থিতি ও তৎপরতাও লক্ষ্য করা গেছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ ও ফুটপাত দখলমুক্ত করে সাধারণ মানুষের চলাফেরা সুগম করার এই উদ্যোগের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)-এর প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানের অনুসারী ও স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের মিছিল ও স্লোগান দিতে দেখা যায়। তারা উচ্ছেদ অভিযানের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিয়ে এলাকা প্রদক্ষিণ করেন। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে এবং ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে সিটি করপোরেশনের এই কঠোর ও ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।