দেশজুড়ে ডেঙ্গুর পাশাপাশি বর্তমানে এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে হাম পরিস্থিতি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিলও। সরকারের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় দফায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হলেও সংক্রমণ কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। কোথাও রোগীর চাপে হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, আবার কোথাও প্রচার-প্রচারণার অভাবে শিশুরা জীবনরক্ষাকারী টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরিস্থিতির সবচেয়ে অবনতি ঘটেছে সিলেট অঞ্চলে। সেখানে হামের সংক্রমণ কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতাল নতুন রোগীর ভিড়ে ভারী হয়ে উঠছে। সম্প্রতি নতুন করে আরও ১৬৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন আরও এক শিশু। এ নিয়ে সিলেট বিভাগে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮১ জনে। শিশু ছাড়াও এখন বয়স্করাও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বর্তমানে বিভাগটির বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫৬৮ জন।
চলতি বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ১ হাজার ৮১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ১২ হাজার। সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মির্জা রিয়াদ হাসান জানান, ক্যাম্পেইনে বিপুল সংখ্যক শিশুকে টিকা দেওয়া হলেও সিলেটে মহামারী আকারে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে, তবে আশা করা হচ্ছে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে। এই সংক্রমণ ঠেকাতে সিলেট বিভাগে প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিশুকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার কাজ চলছে।
মৌলভীবাজার জেলাতেও হামসহ বিভিন্ন মৌসুমী রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। জেলায় এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৯৯০ জন। এর মধ্যে ল্যাব টেস্টে ১৫৮ জনের হাম এবং দুজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছে ১৫টি শিশু। আড়াইশ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে প্রতিদিন চার থেকে সাড়ে চারশো রোগী চিকিৎসা নিতে ভিড় করছেন। হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ৩২ জন ভর্তি রয়েছেন, যার মধ্যে ২৩ জন শিশু ও ৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক। অতিরিক্ত রোগীর চাপে সেখানে তীব্র শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে, ফলে ধারণক্ষমতার বেশি রোগী নিয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
এছাড়া জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের রোগীর চাপও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। চা-বাগানসহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় প্রচারণার ঘাটতি থাকায় অনেক শিশু সময়মতো টিকা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। মৌলভীবাজারের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. জাকির হোসেন জানান, প্রতিটি টিকা কেন্দ্রে নিয়মিত ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হচ্ছে এবং মাইকিংসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। জেলায় ২১ হাজার ৩৪৪ শিশুকে টিকার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও তিন দিনে মাত্র ৪ হাজার ১৭৫ জন টিকা নিতে পেরেছে।
এদিকে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীতেও হামের প্রকোপ কমছে না। নতুন করে আক্রান্ত হয়ে ৫৪ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাম প্রতিরোধে জেলার ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৩৭ হাজার ৭৮৯ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে জেলা প্রশাসন। সমুদ্রপৃষ্টবর্তী ও চরাঞ্চলগুলোতে সংক্রমণের হার বেশি থাকায় এসব এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও টিকাদান জোরদার করা হয়েছে।
কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তেন মং জানিয়েছেন, সরকারের উদ্যোগে দ্রুত ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইন চলমান রয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ক্যাম্পেইন বা টিকাদান চালিয়ে যাওয়া নয়, বরং আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে আইসোলেশন নিশ্চিত করা গেলেই এই বিপজ্জনক সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।