ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,  ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ১ রান দূরে সাদমান, প্রথম দিনে বাংলাদেশের সংগ্রহ ২১৩ স্পেনে দ্রুতগতির দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত অন্তত ৪৬ দেশে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৯ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৯৮২ জাপানের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের উদাত্ত আহ্বান তারেক রহমানের বাউফলে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে কিন্ডারগার্টেন ও দুর্নীতির অভিযোগ ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচন ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে ইসি ইসরায়েলে নির্বাচন: ৬০ শতাংশ ভোট গণনা শেষ, এগিয়ে নেতানিয়াহুর দল খাদ্যে পুষ্টি উপাদান যুক্ত করতে দ্রুত আইন প্রণয়নের তাগিদ প্রতিমন্ত্রীর ক্রসফায়ার মন্তব্যে কোণঠাসা আইজিপি, আলোচনায় ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান রংপুরে দাঁড়িয়ে থাকা ডাম্প ট্রাকে বাসের ধাক্কা, নিহত বেড়ে ৪

আজ আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস

৮২ কোটি টাকার আট শান্তিনিবাসে আজও প্রবীণশূন্য!


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৯:৪৬ এএম

আজ আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। অথচ দেশের প্রবীণ নাগরিকদের জীবনমানের উন্নয়ন, পরিচর্যা ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার মহৎ উদ্দেশ্যে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর চিত্র দেখলে বুক কেঁপে ওঠে। অবহেলিত ও দুর্দশাগ্রস্ত প্রবীণদের শেষ বয়সে একটু শান্তির পরশ বুলিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে নির্মিত আটটি শান্তিনিবাস আজ প্রায় তিন বছর ধরে সম্পূর্ণ উদ্বাহু ও জনবলহীন অবস্থায় তালাবদ্ধ পড়ে আছে। দীর্ঘ জীবনের নানা অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রবীণ মানুষেরা যখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার জায়গা খুঁজছেন, তখন রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত এই দৃষ্টিনন্দন ভবনগুলো ধুলাবালি, শেওলা আর পোকার দখলে চলে গেছে। অথচ এই ভবনগুলোর পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮২ কোটি টাকা।

 

২০২০ সালের জুলাই মাসে দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য ‘শান্তিনিবাস’ নামের এই বিশেষ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, এই প্রকল্পের মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৩ কোটি ৯৮ লাখ ৯১ হাজার টাকা। মূলত ২০২২ সালের জুনের মধ্যে এর নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার কথা নির্ধারিত ছিল।

 

কিন্তু নানা জটিলতা, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও কাজের শ্লথগতির কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে পরবর্তীতে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। এই দীর্ঘসূত্রতার জেরে প্রকল্পের সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮২ কোটি ৬৯ হাজার টাকায়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর জাঁকজমকপূর্ণভাবে একযোগে দেশের আটটি জেলায় এই শান্তিনিবাসগুলোর ‘আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন’ সম্পন্ন করা হয়েছিল। কিন্তু উদ্বোধনের পর কেটে গেছে দীর্ঘ তিন বছর, অথচ একজন প্রবীণ মানুষও সেখানে আশ্রয় পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেননি।

 

সর্বশেষ প্রকাশিত ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর এক বিশাল ও ক্রমবর্ধমান চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ওই শুমারি অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের মোট সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯ জন। যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ২০১১ সালের জনশুমারিতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর এই হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে সমাজে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দিন দিন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভাগভিত্তিক জনশুমারির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের ঢাকা বিভাগে ৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণের সংখ্যা সর্বাধিক—৩৬ লাখ ৬ হাজার ৬৬২ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ২৭ লাখ ৯৫ হাজার ৬৭৯ জন। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ২০ লাখ ৬৯ হাজার ১৬৯ জন, খুলনা বিভাগে ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৬১২ জন, রংপুর বিভাগে ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৭৮৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১২ লাখ ৭৪ হাজার ১১১ জন, বরিশাল বিভাগে ৯ লাখ ৯৭ হাজার ১৮৩ জন এবং সিলেট বিভাগে ৯ লাখ ১৪ হাজার ৭৩৯ জন প্রবীণ নাগরিক বসবাস করছেন। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের জীবনসংগ্রাম যখন অত্যন্ত দুর্বিষহ, তখন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তৈরি এই নিবাসগুলো অব্যবহৃত পড়ে থাকা অত্যন্ত মর্মান্তিক।

 

সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ৬০ বছরের বেশি বয়সী পরিত্যক্ত, দাবিদারহীন, দুর্দশাগ্রস্ত ও অবহেলিত প্রবীণ ব্যক্তিদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের ব্যবস্থা করার লক্ষ্যেই শান্তিনিবাস প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল। আবাসনের জন্য অত্যন্ত চমৎকার কৌশলগত স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল সরকারি শিশু পরিবারগুলোর চত্বরগুলোকে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, প্রবীণ নাগরিকদের সঙ্গে শিশু পরিবারের শিশুদের একটি চমৎকার সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি হবে, যেখানে শিশুরা পারিবারিক উষ্ণতা ও পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে প্রবীণরা তাঁদের জীবনের শেষ দিনগুলোতে উপযুক্ত পরিচর্যা, নিরাপত্তা এবং উন্নত জীবনমান উপভোগ করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে এই মহৎ পরিকল্পনা কেবল কাগজ-কলম আর উদ্বোধনের ফিতাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

 

জানা গেছে, যে আটটি জেলায় এই শান্তিনিবাসগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে গোপালগঞ্জ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালী জেলার শান্তিনিবাসগুলো শুধুমাত্র নারীদের জন্য সংরক্ষিত। অন্যদিকে পুরুষ প্রবীণদের বসবাসের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল জেলার অপর চারটি নিবাস। প্রতিটি শান্তিনিবাসে অন্তত ২৫ জন করে প্রবীণ নাগরিকের একসঙ্গে বসবাসের সম্পূর্ণ সুব্যবস্থা রয়েছে।

 

অর্থাৎ এই আটটি কেন্দ্র পুরোপুরি চালু হলে একসঙ্গে মাত্র ২০০ জন প্রবীণ ব্যক্তির নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে ৫০ শয্যার একটি নিবাস রয়েছে যা সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হয়, তবে সেখানে প্রবীণদের সম্পূর্ণ নিজ খরচে এবং টাকার বিনিময়ে থাকতে হয়। একইভাবে বেসরকারি উদ্যোগে কিছু প্রবীণ নিবাস গড়ে উঠলেও সেগুলোর ব্যয়ভার বহন করাও সাধারণ ও দরিদ্র প্রবীণদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সরকারি এই শান্তিনিবাসগুলোর ওপরই দেশের অসহায় প্রবীণদের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল।

 

শান্তিনিবাসগুলোর অবকাঠামোগত নকশা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি শান্তিনিবাস একই সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক নকশার আদলে নির্মাণ করা হয়েছে। পাঁচতলা ভিত্তির ওপর নির্মিত হয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন ভবন। প্রতিটি ভবনের মোট আয়তন ১ হাজার ৬২১ বর্গমিটার। এই ভবনগুলোতে প্রবীণদের দৈনন্দিন আরামদায়ক জীবনের কথা মাথায় রেখে লিফট, সুদৃশ্য অভ্যর্থনা কক্ষ, দর্শনার্থী কক্ষ, বসার প্রশস্ত জায়গা, উন্নত শয্যাকক্ষ, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা কর্নার, বিনোদনের সুব্যবস্থা, শরীরচর্চার আলাদা কর্নার, শান্ত পরিবেশের প্রার্থনাকক্ষ, প্রশিক্ষণ কর্নার এবং মনোরম কফি কর্নারসহ হরেক রকমের সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের সরাসরি তত্ত্বাবধানে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তর এই প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করেছে। প্রতিটি ভবন নির্মাণে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খরচ করা হয়েছে প্রায় ছয় থেকে সাত কোটি টাকা করে। শুধু তা-ই নয়, প্রবীণদের ব্যবহারের জন্য উন্নত মানের আসবাবপত্র ও অন্যান্য অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও পৃথক বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।

 

তবে বাস্তবতা হলো, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এত costly অবকাঠামো আজ ধ্বংসের মুখে। আটটি জেলার শান্তিনিবাসগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শনে এক করুণ ও হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব নিবাস কেন আজও চালু করা সম্ভব হয়নি, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর সমাজসেবা কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে প্রায় অভিন্ন ও প্রথাগত উত্তর পাওয়া যায়। সব জেলার কর্মকর্তারা একবাক্যে স্বীকার করেছেন যে, রাজকীয় ভবন তৈরি হলেও আজ পর্যন্ত এর বিপরীতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা হয়নি। এমনকি প্রতিটি নিবাস নিয়মিত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে নির্দিষ্ট ও নিয়মিত বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল, সেটিও আজ পর্যন্ত অনুমোদন লাভ করেনি। ফলে তালাবদ্ধ অন্ধকার কক্ষে বছরের পর বছর ধরে নষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ টাকার মূল্যবান আসবাবপত্র।

 

বরিশাল শহরের সাগরদী সরকারি শিশু পরিবার (বালক) প্রাঙ্গণে নির্মিত শান্তিনিবাসের ভেতরটা ঘুরে দেখলে যে কারো চোখ কপালে উঠবে। সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটির মেঝে, সিঁড়ি এবং সুপ্রশস্ত বারান্দায় পুরু ধুলার স্তর জমে গেছে। প্রবীণদের শারীরিক ফিটনেস ঠিক রাখার জন্য আনা শরীরচর্চার আধুনিক সরঞ্জাম, দামি আসবাবপত্র ও অন্যান্য উপকরণগুলো অযত্নে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। ভবনের লিফটটি চালুই করা হয়নি। চারপাশের পরিবেশ ও ভবনের বিভিন্ন অংশে চরম অবহেলার ছাপ স্পষ্ট।

 

এ বিষয়ে বরিশালের বিশিষ্ট প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে জানান, বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থে দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণের পরও দীর্ঘ সময় জনবলের অজুহাতে শান্তিনিবাস চালু না করা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য। এটি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের চরম উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর মধ্য দিয়ে এটিই প্রমাণিত হয় যে, প্রবীণ নাগরিকদের অবহেলা করার সংস্কৃতি কেবল সমাজ ও সাধারণ পরিবারের চারদেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীরেও প্রোথিত রয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম জানান, প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে তিনতলা এই শান্তিনিবাস ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ২০২৩ সালের জুনে। এর পরপরই আরও প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় করে নিবাসটিকে পুরোপুরি বসবাসের উপযোগী করা হয় এবং পরবর্তীতে ভবনটি যথাযথ নিয়ম মেনে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

 

একই চিত্র দেখা গেছে বিভাগীয় শহর রাজশাহীর পবা উপজেলার বায়া এলাকায় অবস্থিত শান্তিনিবাসটিতেও। গত ৫ আগস্ট সেখানে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, প্রবীণদের জন্য তৈরি সেই শান্তিনিবাসটিতে তখন অন্য এক দৃশ্য—সেখানে রীতিমতো একটি চলচ্চিত্রের শুটিং চলছে! স্থানীয় এক চলচ্চিত্র পরিচালক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ভবনের নিচতলার দুটি কক্ষে একটি পুলিশি কার্যক্রমের দৃশ্য ধারণ করছিলেন। শুটিংয়ের সুবিধার্থে ভবনের একটি কক্ষকে রীতিমতো থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষ হিসেবে সাজানো হয়েছিল।

 

আরেকটি বড় কক্ষে চলচ্চিত্রের কলাকুশলীদের বসা ও দুপুরের খাওয়ার জমজমাট ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অথচ ভবনের ভেতরের অন্য কক্ষগুলোতে ঝুলছিল তালা। ভেতরে অবহেলায় পড়ে ছিল শরীরচর্চার যন্ত্র, উন্নত মানের তৈজসপত্র, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মূল্যবান সরঞ্জাম। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, ভবনের সামনের মূল ভিত্তিফলকটিতে একসময় তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রীর নাম খোদাই করা থাকলেও বর্তমানে তা কালি দিয়ে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে। সেই ভিত্তিফলকটিতে উদ্বোধনের তারিখ হিসেবে ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর লেখা রয়েছে। রাজশাহী সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনিরা খাতুন জানিয়েছেন যে, এই শান্তিনিবাসটি নিয়মিত পরিচালনা ও দেখভাল করার মতো কোনো লোকবল বা জনবল তাদের হাতে নেই।

 

গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া দুস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের ভেতরে নির্মিত শান্তিনিবাসের চিত্রও বেশ হতাশাজনক। সেখানে গিয়েও দেখা গেছে দীর্ঘদিনের অযত্ন ও চরম অবহেলার স্পষ্ট ছাপ। ব্যবহার না করার ফলে ভবনের কক্ষগুলো অন্ধকার ও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। বিছানাপত্রে ময়লা জমে নষ্ট হচ্ছে, কোথাও কোথাও দেয়াল ও ছাদ স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে। দেখলেই বোঝা যায় যে, এই বিশাল ভবনের ওপরের তলাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার বা রক্ষণাবেক্ষণ করার কেউ নেই। গোপালগঞ্জ দুস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক তথা সহকারী পরিচালক শীলা সাহা জানান, মাঝেমধ্যে লোকবল দিয়ে শুধু ভবনের নিচতলা কোনো রকমে পরিষ্কার করা হয়, তবে ওপরের তলাগুলোর অবস্থা আরও করুণ।

 

খুলনা নগরের মহেশ্বরপাশা এলাকায় সরকারি শিশু পরিবারের চত্বরে অবস্থিত শান্তিনিবাসের অবস্থাও কম শোচনীয় নয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কোনো মানুষের পদচারণা না থাকায় সিঁড়ি, সুদীর্ঘ বারান্দা ও ভবনের দেওয়ালে সবুজ শেওলা জমে গেছে। ভবনের লোহার রেলিংগুলোয় মরচে ধরতে শুরু করেছে। ভবনের নিচতলায় নির্ধারিত ‘ডক্টরস রুম’-এর ভেতর একটি বেড, বেশ কয়েকটি হুইলচেয়ার এবং থেরাপি বেডসহ জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী পড়ে রয়েছে। পাশের জিম রুমে শরীরচর্চার আধুনিক যন্ত্র ও বেশ কয়েকটি বড় বাক্স পড়ে আছে। নিচতলার ডাইনিং রুমে পাতা রয়েছে বড় আকারের দুটি ডাইনিং টেবিল। এছাড়া ভবনে কিছু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা ফায়ার এক্সটিংগুইশার স্থাপন করা হলেও দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় সেগুলোর মেয়াদের তারিখ অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। খুলনা বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক খান মোতাহার হোসেন স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘদিন ধরে ভবনগুলো বন্ধ থাকায় ভেতরের দামি আসবাব ও অন্যান্য সরঞ্জাম ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

 

লালমনিরহাট শহরের কলেজ রোডের পাশে সরকারি শিশু পরিবারের (বালিকা) ক্যাম্পাসের ভেতর ৩০ শতক জমির ওপর নির্মিত শান্তিনিবাসটির অবস্থাও প্রায় একই রকম শোচনীয়। গত ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটির প্রতিটি কক্ষ বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করার কারণে ভবনটির বৈদ্যুতিক সংযোগও বর্তমানে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এছাড়া লিফট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে অপারেটিং চুক্তি করা হয়েছিল, তার মেয়াদও অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের নথিপত্র থেকে জানা যায়, প্রায় ৮ কোটি ১ লাখ ৪১ হাজার ৩২৯ টাকা ব্যয়ে এই ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট লালমনিরহাট জেলা গণপূর্ত অধিদপ্তর ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে।

 

অথচ প্রায় তিন বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও একজন প্রবীণ মানুষও এই ভবনের ছোঁয়া পাননি। লালমনিরহাট সরকারি শিশু পরিবারের বালিকা শাখার উপতত্ত্বাবধায়ক মোছা. হাওয়া খাতুন নিজস্ব উদ্যোগে শান্তিনিবাসটি দেখভাল করার চেষ্টা করে আসছেন। তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর লালমনিরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে একটি লিখিত চিঠি পাঠিয়েছিলেন। ওই চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয় যে, শান্তিনিবাসটি নিয়মিত চালু না করার কারণে কোটি কোটি টাকার ভবন এবং এর ভেতরের মূল্যবান আসবাবপত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত চালু করা হলে এলাকার দুস্থ ও অসহায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বিশাল কল্যাণ সাধিত হতো।

 

চিঠিতে উল্লেখিত এই আকুতির সঙ্গে লালমনিরহাট সদরের আদর্শ পাড়ার সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা আছিয়া খাতুনের কথার চমৎকার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর স্বামী প্রায় ২০ বছর আগে মারা গেছেন। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে, যারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তাঁদের নিজেদের সংসারেই চরম টানাটানির দিন কাটছে। আছিয়া খাতুন অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে জানান যে, তাঁর নিজের স্থায়ীভাবে মাথা গোঁজার কোনো সুব্যবস্থা নেই। কখনো ছেলের সংসারে একটু থেকে আবার কখনো মেয়ের বাড়িতে গিয়ে তিনি দিন কাটান। লালমনিরহাটের প্রবীণদের জন্য যে শান্তিনিবাস তৈরি হয়েছে, সে কথা তিনি শুনেছেন। তাঁর বুকভরা আশা, এই নিবাসটি যদি সত্যিই একদিন চালু হয়, তবে জীবনের বাকি কটা দিন তিনি একটু শান্তিতে সেই আশ্রয়ে কাটাতে পারবেন।

 

সুনামগঞ্জ পৌর শহরের পূর্ব প্রান্তে হাছননগর এলাকার সরকারি শিশু পরিবার প্রাঙ্গণে নির্মিত শান্তিনিবাসটির চিত্রও অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দীর্ঘকাল ধরে তালাবদ্ধ থাকায় ভবনের ভেতরের দামি আসবাবপত্রগুলো নষ্ট হয়ে পচে যাচ্ছে। এমনকি ভবনের পানি সরবরাহের প্রধান পাম্পটিও দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে আছে।

 

হাছননগর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মুজাহিদুল ইসলাম আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, এই শান্তিনিবাসটির অবস্থান শহরের ভেতরে হলেও এর চারপাশের পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম ও গ্রামীণ। পাশেই রয়েছে শান্ত হাওর, সবুজ গ্রাম এবং কোলাহলমুক্ত নিবিড় পরিবেশ। প্রবীণদের বসবাসের জন্য এমন একটি সুন্দর স্থান নির্বাচন করা অত্যন্ত উপযুক্ত হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এত সুন্দর একটি উদ্যোগ কেবল প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে সম্পূর্ণ অব্যবহৃত ও তালাবদ্ধ পড়ে আছে।

 

ময়মনসিংহ শহরের শম্ভুগঞ্জে সরকারি শিশু পরিবারের ভেতরে অবস্থিত শান্তিনিবাসে প্রবেশ করলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে চরম অব্যবস্থাপনার দৃশ্য। ভবনের বিভিন্ন কক্ষের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আরামদায়ক বিছানা, আলমারি, টেবিলসহ প্রয়োজনীয় সব আসবাবপত্র। কিন্তু ছাদ ও ছাদের পাইপ ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় বৃষ্টির পানি সরাসরি ভবনের বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করে আসবাবপত্র ভিজিয়ে নষ্ট করছে। পানি জমে যাওয়ার ভয়ে কর্মীরা বাধ্য হয়ে খাটের ওপর টেবিল ও আলমারি তুলে রেখেছেন।

 

ময়মনসিংহ সরকারি শিশু পরিবারে ‘বড় ভাইয়া’ পদে কর্মরত মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন জানান, বর্ষার মৌসুমে বৃষ্টির সময় ভবনের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে কৃত্রিম জলাশয়ের সৃষ্টি হয়। ছাদ থেকে পানি নিষ্কাশনের সরু পাইপগুলো ময়লা ও গাছের পাতায় আটকে যাওয়ার কারণে বৃষ্টির পানি সরাসরি রুমের ভেতরে ঢুকে মূল্যবান আসবাবপত্র তছনছ করে দিচ্ছে। এভাবেই প্রায় সব আসবাবপত্র নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই শিশু পরিবারে প্রায় দুই বছর ধরে বসবাস করছে ১০ বছর বয়সী শিশু রিফাত মিয়া। তার বাড়ি ফুলপুর উপজেলার সল্পা গ্রামে। তার বাবা বছরখানেক আগে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর তার ঠাঁই হয়েছে শিশু পরিবারের আশ্রয়ে। নিষ্পাপ শিশু রিফাত অত্যন্ত সরল মনে জানায়, ‘এখানে যদি বয়স্ক মানুষেরা থাকতেন, তবে তাঁরা আমাদের দাদা-নানার মতো আদরে ও স্নেহে থাকতেন। তাঁদের সঙ্গে সময় কাটানো যেত, আমাদেরও মন অনেক ভালো থাকত।’

 

নোয়াখালীর শান্তিনিবাসের বর্তমান চিত্রটি একটু ভিন্ন হলেও সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার গল্প একই। বর্তমানে এই শান্তিনিবাসটিতে কোনো প্রবীণ মানুষ নন, বরং সরকারি শিশু পরিবারের শিশু, কিশোরী ও তরুণীরা বসবাস করছেন। এর পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক শ্যামল চন্দ্র পাল জানান, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় সরকারি শিশু পরিবারের পুরোনো ও জরাজীর্ণ মূল ভবনের ভেতরে বন্যার পানি ঢুকে সেটি সম্পূর্ণ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে জেলা প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি নিয়ে শিশু পরিবারের সদস্যরা সাময়িকভাবে এই শান্তিনিবাসের ভবনে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছে।

 

তবে নোয়াখালী শান্তিনিবাসের নির্মাণকাজের মান ও প্রকৌশলগত ত্রুটি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাঁদের অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার কক্ষটি মূল ভবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা স্থানে হওয়ার কথা থাকলেও এখানে সেটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে মূল ভবনের ভেতরের একটি অংশে স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এছাড়া শান্তিনিবাসে আধুনিক লিফট স্থাপন করা হলেও সেটি প্রবীণদের ব্যবহারের তো প্রশ্নই আসে না, বরং উদ্বোধনের আগেই পুরোপুরি অচল ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে আছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের পক্ষ থেকে কেবল জনকল্যাণমূলক বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করলেই তার সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না। প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং তদারকি প্রয়োজন, সেখানেও অনেক সময় মারাত্মক ঘাটতি থেকে যায়। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা অত্যন্ত যৌক্তিক সমালোচনা করে গণমাধ্যমকে জানান, শুধু লোক দেখানো প্রকল্প গ্রহণ করলেই জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে না, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক।

 

সেই উদ্যোগে যদি নীতিনির্ধারকদের অনীহা ও ঘাটতি থাকে, তবে ধরে নিতে হবে যে ওই প্রকল্প প্রণয়নকারীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল কেবল কোটি কোটি টাকা খরচ করে ইটের ভবন নির্মাণ করা। এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত উদ্যোগের আড়ালে মূলত দুর্নীতির পথ প্রশস্ত হয় এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির পকেট ভারী হয়। অথচ ভবন পুরোপুরি প্রস্তুত ও ঝকঝকে থাকলেও আটটি শান্তিনিবাসের একটির জন্যও প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো বা পদ সৃষ্টি করা হয়নি। এসব বিলাসবহুল ভবন দেখভাল কিংবা পরিচালনার জন্য কোনো নিয়মিত বাজেট বরাদ্দও দেওয়া হয় না। সুনামগঞ্জ জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও মনে করেন, প্রতিটি শান্তিনিবাস সঠিকভাবে ও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ২৫ জন প্রশিক্ষিত জনবল প্রাথমিকভাবে জরুরি। একই সঙ্গে অসুস্থ প্রবীণদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য সার্বক্ষণিক একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসককে সেখানে নিয়োগ দেওয়া অপরিহার্য।

 

অবশ্য এত দীর্ঘ হতাশা ও সমালোচনার পর কিছুটা আশার আলো দেখানোর চেষ্টা করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্‌বুব গতকাল দুপুরে মুঠোফোনে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বক্তব্যে আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান যে, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে এত দিন শান্তিনিবাসগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি—এটি অনস্বীকার্য সত্য। তবে এই অচলাবস্থা কাটানোর জন্য আটটি শান্তিনিবাস চালুর উদ্দেশ্যে গত মাসেই প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তিনি অত্যন্ত আশাবাদী সুরে জানান যে, চলতি অক্টোবরের মধ্যেই সবকটি শান্তিনিবাস আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা সম্ভব হবে এবং প্রবীণ নাগরিকদের সেখানে তুলে দেওয়া যাবে।

 

দেশের প্রবীণ নাগরিকদের জন্য শান্তিনিবাস প্রকল্প চালুর মূল ভাবনাটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও মানবিক ছিল। কিন্তু দীর্ঘ তিন বছর ধরে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্মিত ভবনগুলোতে তালা ঝুলিয়ে রাখার এই সংস্কৃতি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের মধ্যে এক বিরাট ব্যবধান রয়ে গেছে।

 

সমাজ ও পরিবার যখন বয়স্ক মানুষের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রই তাদের শেষ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জনবলের অজুহাত এবং দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে পড়ে আজ দেশের অসহায় প্রবীণদের সেই শেষ ভরসাস্থলগুলোও অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যে এই শান্তিনিবাসগুলো সত্যিই চালু হবে কি না এবং বাস্তবেই দেশের অবহেলিত প্রবীণ মানুষগুলো সেখানে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের দেখা পাবেন কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়। দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রত্যাশা, আমলাতান্ত্রিক সব জটিলতার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত এই নিবাসগুলোর দরজা প্রবীণদের জন্য উন্মুক্ত করা হোক, যাতে জীবনের শেষ গোধূলিলগ্নে এসে তাঁরা একটু সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে পারেন।

 


এ সম্পর্কিত আরো খবর