২০২৪ সালের আগস্ট মাসের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিজ ভূখণ্ডে আশ্রয় দেওয়া ছাড়া তৎকালীন নয়াদিল্লির হাতে আর কোনো কৌশলগত বা মানবিক বিকল্প খোলা ছিল না। রাজধানীর একটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে এই চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। দুই দেশের বর্তমান ভূরাজনৈতিক সমীকরণ, কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বিগত দিনের উত্তপ্ত পরিস্থিতির নানা দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনার সময় তিনি এই স্পর্শকাতর বিষয়টির পেছনের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন।
গত শনিবার রাজধানীতে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের একটি বিশেষ সেশনে যোগ দিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার এই মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে যখন বাংলাদেশে নজিরবিহীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চরম সংকটের সৃষ্টি হয়, ঠিক সেই জটিল মুহূর্তে শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য হন। তিনি যখন ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশ করেন এবং অবতরণ করেন, তখনো তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বহাল ছিলেন। এমন এক আকস্মিক ও অভাবনীয় পরিস্থিতিতে তাঁকে মানবিক কারণে ভারতে প্রবেশ ও সাময়িক আশ্রয় দেওয়া ছাড়া ভারতের নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের সামনে অন্য কোনো কূটনৈতিক বা মানবিক পথ অবশিষ্ট ছিল না।
ঘটনার পেছনের নানা অজানা তথ্যের বিবরণ দিয়ে দিনেশ ত্রিবেদী জানান, ওই দিন যে সামরিক বিমানটি ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিল, তার জন্য ভারত বা দেশটির বিমানবাহিনী আগে থেকে কোনো প্রস্তুতি নিয়ে রাখেনি। সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলের খবরাখবরের বিষয়ে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, তিনি নিজেও সে সময় টেলিভিশনের স্ক্রলে দেখেছিলেন যে বিমানটি হয়তো অন্য কোনো গন্তব্যে বা দেশের দিকে উড়ে যাচ্ছে। কিন্তু যখন বিমানটি ভারতের দিকে আসার বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তখন একটি ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া এবং অত্যন্ত দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছিল।
যদি সেই সঙ্কটময় মুহূর্তে ভারতীয় ভূখণ্ডে বিমানটিকে অবতরণের অনুমতি না দেওয়া হতো, তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, অনিয়ন্ত্রিত ও ঝুঁকিপূর্ণ মোড় নিতে পারত, সে সম্পর্কে কারোই সঠিক ধারণা ছিল না। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, ভারতীয় কোনো সামরিক বাহিনী বা বিমানবাহিনী তাঁকে সে সময় জোর করে বা কোনো পূর্বপরিকল্পিত গোপন অপারেশনের মাধ্যমে ভারতে নিয়ে আসেনি; বরং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে চড়েই নিজ দেশ ত্যাগ করে ভারতে পৌঁছাতে সক্ষম হন। আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখা এবং প্রতিবেশীসুলভ দায়িত্ববোধের তাগিদেই তৎকালীন সময়ে নয়াদিল্লি তাৎক্ষণিকভাবে ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।
এদিকে, কনফারেন্সের মুক্ত আলোচনায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বা প্রত্যর্পণের জোরালো দাবির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ভারতীয় হাইকমিশনার অত্যন্ত সতর্ক, পরিমিত ও কূটনৈতিক ভাষায় উত্তর দেন। তিনি জানান, এই আইনি হস্তান্তরের পুরো বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক দরকষাকষি, হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত বা একক কোনো প্রজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করে না; বরং এর পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘমেয়াদী, সুগঠিত ও প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়া। এটি সম্পূর্ণভাবে বিচারিক কাঠামোর অধীন এবং দেশের আদালত এই বিষয়টি নিয়ে নিজস্ব কার্যপরিধিতে কাজ করছে।
যেহেতু পুরো বিষয়টি বিচারাধীন এবং একটি নির্দিষ্ট নিয়মতান্ত্রিক আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তাই এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বা আগাম টাইমফ্রেম বেঁধে দেওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। বাংলাদেশ এবং ভারত উভয় দেশই দক্ষিণ এশিয়ার প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজ নিজ দেশের স্বাধীন আইনি ও বিচারিক ব্যবস্থাকে সর্বাগ্রে সম্মান করে, এবং এই আইনি প্রক্রিয়া তার নিজস্ব গতিতেই ন্যায়সঙ্গত উপায়ে সম্পন্ন হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।