দেশে ডেঙ্গু কিংবা অন্যান্য মৌসুমী রোগের পাশাপাশি হামের সংক্রমণ ও এর উপসর্গজনিত মৃত্যু পরিস্থিতি এখন এক গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটের রূপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ও সাম্প্রতিক হেলথ বুলেটিনে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আটজন রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই ধারাবাহিক মৃত্যুর ঘটনা দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য খাতের ওপর নতুন করে গভীর চাপ সৃষ্টি করেছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ১০২ জনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পাশাপাশি, হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন আরও ১ হাজার ২০ জন। সবমিলিয়ে চলতি বছর দেশজুড়ে হাম এবং এর উপসর্গজনিত বিভিন্ন জটিলতার কারণে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১শ ২২ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার এই সময়ে কেবল রাজধানী ঢাকাতেই হামের উপসর্গ নিয়ে আটজন রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হাম ও এর মারাত্মক উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১শ ৫৩ জন নতুন রোগী। এটি দেশের বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর তৈরি হওয়া অতিরিক্ত রোগীর চাপকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিভাগভিত্তিক রোগী ভর্তির পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রোগী হাসপাতালে আশ্রয় নিয়েছেন। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, এই সময়ে ঢাকা বিভাগে ৪৪৪ জন, চট্টগ্রামে ২২৪ জন, সিলেটে ১৫৮ জন এবং বরিশালে ১৩৮ জন রোগী চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ছুটে গেছেন। এছাড়া খুলনা বিভাগে ৭জ3 জন, ময়মনসিংহে ৪৯ জন, রংপুরে ৩৯ জন এবং উত্তরবঙ্গের রাজশাহী বিভাগে ২৪ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। দেশের প্রায় প্রতিটি বিভাগীয় অঞ্চলে হামের এই আক্রমণাত্মক বিস্তার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মারাত্মকভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সময়মতো সঠিক চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৫৬ জন রোগী। অর্থাৎ আক্রান্তদের একটি বিশাল অংশ চিকিৎসকদের নিবিড় পরিচর্যা ও চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে সুস্থতা লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন, যা কিছুটা স্বস্তির বিষয়।
এদিকে, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই স্বাস্থ্য সংকটে দেশে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের রোগীর মোট সংখ্যা পৌঁছেছে ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৯৭ জনে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও চিকিৎসকদের পর্যালোচনার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ২১ হাজার ৬৬৬ জন। জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করছেন, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরালোভাবে পরিচালনা না করা হলে এই ভাইরাসের মারাত্মক সংক্রমণ রোধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।