রাজধানীর মাটিতে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্মেলনে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতির এক দীপ্তিময় ও স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জোরালোভাবে জানিয়েছেন যে, বর্তমান বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে এমন এক শক্ত, আত্মবিশ্বাসী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে উন্নীত হয়েছে যেখানে বাইরের কোনো পরাশক্তির স্বার্থে বা অন্যের ভূরাজনৈতিক খেলায় গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। দেশ এখন নিজস্ব সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব শর্তেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণ পরিচালনা করবে।
গত শনিবার রাজধানীর অভিজাত প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘নতুন করে গড়ে ওঠা এক বিশ্বে ক্ষমতা, প্রযুক্তি ও আস্থার পথচলা’ শীর্ষক স্লোগানে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনফারেন্সের ‘নতুন করে লেখা এক বিশ্ব’ শীর্ষক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি এই নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেন। বর্ণাঢ্য এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেশনে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে পারস্পরিক আলোচনা, কূটনৈতিক সহযোগিতা ও সমান অংশীদারত্ব বজায় রাখতে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। তবে যেকোনো দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের সাধারণ জনগণের স্বার্থ রক্ষা করাই হবে পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে মূল এবং অপরিবর্তনীয় বিষয়।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান রাজনৈতিক উত্তাপ ও বৈশ্বিক সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে যে ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়েছে, তা মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া নানা বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, অতীতে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন যুদ্ধের মতো অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশকে মারাত্মক জ্বালানি ঘাটতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মতো বহুমুখী বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা বিবেচনায় জ্বালানি খাতের ওপর থেকে আমদানিনির্ভরতার চাপ কমাতে সরকার নানামুখী উৎস ও বহুমুখীকরণের ওপর সর্বাত্মক জোর দিচ্ছে।
বিশেষ করে, অতীতে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির নতুন ও সম্ভাবনাময় উৎসগুলো অনুসন্ধানে বিগত সরকারগুলোর পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর বা আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল, দূরদর্শী ও জনবান্ধব নেতৃত্বে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ইতিমধ্যেই সেই অব্যবহৃত খাতগুলোর অনুসন্ধান ও যথাযথ সদ্ব্যবহারের কাজ পুরোদমে শুরু করে দিয়েছে। পাশাপাশি, দেশের সাধারণ মানুষকে জ্বালানি সংকট থেকে মুক্তি দিতে এবং প্রতিটি নাগরিককে জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলতে সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার প্রসারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদী মানবিক সংকটের অন্যতম বড় দিক হিসেবে রোহিঙ্গা সমস্যার কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরে শামা ওবায়েদ জানান যে, বিগত এক দশকেরও অধিক সময় ধরে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ ভূখণ্ডে আশ্রয় দিয়ে আসছে। দীর্ঘস্থায়ী এই উপস্থিতির ফলে বিষয়টি বর্তমানে দেশের জাতীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামোর ওপর একটি বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও, বাঙালি জাতির চিরায়ত মানবিক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বাংলাদেশ সবসময় এই সংকট নিরসনে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব প্রদর্শন করে আসছে। তবে এই মানবিক সংকটের কোনো দীর্ঘমেয়ায়ী ভার একা বহন করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার বিশ্বমঞ্চের বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং সকল উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে নিয়মিত ও কার্যকর আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হলো—রিসোর্স ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল প্রত্যাবাসন যত দ্রুত সম্ভব নিশ্চিত করা।