দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা এবং আমদানির ওপর চর্বিতচর্বণ নির্ভরতার মুখে দ্বীপ জেলা ভোলার বিশাল গ্যাসসম্পদ জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভোলার গ্যাস এখন অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জাতীয় গ্রিডে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই প্রাকৃতিক সম্পদ দেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মোট পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে ভোলার শাহবাজপুর, ভোলা-নর্থ ও ইলিশা—এই তিনটি প্রধান আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ দশমিক ০৪৭ টিসিএফ গ্যাসের মজুত রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৪৩২ থেকে ১ দশমিক ৪৩৩ টিসিএফ গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য। অর্থাৎ, দেশের মোট অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের প্রায় ১৯ শতাংশ বা প্রায় এক-পঞ্চমাংশই সংরক্ষিত রয়েছে ভোলার ভূগর্ভে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)-এর তথ্য অনুসারে, ভোলার মোট নয়টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। তবে সঞ্চালন অবকাঠামো ও পাইপলাইনের সীমাবদ্ধতার কারণে এর একটি বড় অংশ এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে। বর্তমানে দৈনিক মাত্র প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে, আর অবকাঠামোগত সংকটের কারণে প্রায় ৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান মনে করেন, গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও তা দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সর্বাগ্রে শক্তিশালী সঞ্চালন অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এই সংকট নিরসনে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং ডিপিপি প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। এই বিশাল অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভোলার গ্যাস শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, বরং বৃহত্তর জাতীয় গ্যাস গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পাঞ্চল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি চাহিদা পূরণে বিপ্লব ঘটাতে পারবে। এর ফলে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর জাতীয় অর্থনীতির পরনির্ভরশীলতা যেমন হ্রাস পাবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ও নিশ্চিত হবে।
শুধু জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ নয়, বরং ভোলায় উৎপাদিত গ্যাস স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবহার করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলারও সুযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাসভিত্তিক শিল্প এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে যেতে পারে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, দেশের সার্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও ভোলার গ্যাস ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান উল্লেখ করেছেন যে, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করার জন্য ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে এবং বাপেক্সের কূপ খনন কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম মনে করেন, ভোলার গ্যাসের প্রকৃত সুফল পেতে হলে সঠিক পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজনের বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে। বড় বিনিয়োগের আগে বাস্তবসম্মত উত্তোলনযোগ্য মজুত নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও মনে করছেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, উন্নত সড়ক যোগাযোগ এবং নদীবন্দরসহ অন্যান্য অবকাঠামো একসঙ্গে গড়ে উঠলে ভোলা দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পহাবে পরিণত হতে পারে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি এবং সুচিন্তিত পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ভোলার এই গ্যাসই হয়ে উঠতে পারে আগামীর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি।