ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,  ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ১ রান দূরে সাদমান, প্রথম দিনে বাংলাদেশের সংগ্রহ ২১৩ স্পেনে দ্রুতগতির দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত অন্তত ৪৬ দেশে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৯ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৯৮২ জাপানের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের উদাত্ত আহ্বান তারেক রহমানের বাউফলে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে কিন্ডারগার্টেন ও দুর্নীতির অভিযোগ ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচন ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে ইসি ইসরায়েলে নির্বাচন: ৬০ শতাংশ ভোট গণনা শেষ, এগিয়ে নেতানিয়াহুর দল খাদ্যে পুষ্টি উপাদান যুক্ত করতে দ্রুত আইন প্রণয়নের তাগিদ প্রতিমন্ত্রীর ক্রসফায়ার মন্তব্যে কোণঠাসা আইজিপি, আলোচনায় ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান রংপুরে দাঁড়িয়ে থাকা ডাম্প ট্রাকে বাসের ধাক্কা, নিহত বেড়ে ৪

সংকটের আবর্তে ১৬ সরকারি মেডিকেল কলেজ, তবুও থামছে না নতুন অনুমোদন


  • আপলোড সময় : রবিবার ০৪ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৪:৪৫ পিএম

দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞান শিক্ষার মূল ভিত্তি এখন চরম প্রতিকূলতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ছাড়াই রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার সংস্কৃতি চিকিৎসা খাতকে এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট ১১০টি মেডিকেল কলেজের মধ্যে ৩৭টি সরকারি হলেও, ২০০৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত তুলনামূলক নতুন ১৬টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ভয়াবহ সংকট ও ঘাটতির মুখে ধুঁকছে। নিজস্ব ক্যাম্পাস, পর্যাপ্ত শিক্ষক, উপযুক্ত অবকাঠামো কিংবা মানসম্মত হাসপাতাল না থাকার পরও এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে চিকিৎসক বের হয়ে আসছেন, যা দেশের সামগ্রিক চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে বড় ধরণের প্রশ্ন ও জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, বিগত ও বর্তমান সরকারগুলোর নীতিমালায় সংকট সমাধানের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবে নতুন মেডিকেল কলেজ চালুর প্রবণতা বেশি জোরালো রয়েছে।


দেশের অন্যতম নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার এক দশক পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত নিজস্ব কোনো জমির বন্দোবস্ত করতে পারেনি। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজটি ২০১৮ সাল থেকে আটতলা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তিন হাজার বর্গফুটের ছোট্ট পরিসরে মাত্র পাঁচটি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান প্রক্রিয়া সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের জন্য নেই কোনো নিজস্ব আবাসন বা হোস্টেল সুবিধা। শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণের জন্য হাসপাতালে প্রয়োজনীয় রেজিস্ট্রার না থাকায় তাদের লার্নিং প্রসেস মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শুধুমাত্র হবিগঞ্জই নয়, এই চিত্র দেশের আরও বেশ কয়েকটি সরকারি মেডিকেল কলেজের।


পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৬টি নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজের মধ্যে অন্তত পাঁচটি কলেজের কোনো নিজস্ব জমি কিংবা ভবন নেই। এই তালিকায় হবিগঞ্জ ছাড়াও যুক্ত রয়েছে নেত্রকোনা, নওগাঁ, মাগুরা ও নীলফামারী মেডিকেল কলেজ। ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসানের ব্যক্তিগত সদিচ্ছা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত হয় নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ। অথচ কলেজটির অনুমোদনের সময় নামমাত্রও জমির সংস্থান করা হয়নি। বর্তমানে নেত্রকোনা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালের উত্তর পাশে চিকিৎসকদের জন্য নির্ধারিত আবাসিক ভবনগুলোকে একাডেমিক কাজের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ, একটি আবাসিক বাড়ির ভেতরেই চলছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়ের পাঠদান। একইভাবে চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রেও নিজস্ব জমির প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, আর ক্লাস চলছে সদর হাসপাতালের সীমিত কয়েকটি কক্ষে।


যাঁরা নিজস্ব জমি ও ভবন পেয়েছেন, তাঁদের অবস্থাও খুব একটা সন্তোষজনক নয়। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পাবনা মেডিকেল কলেজের নিজস্ব ভবন থাকলেও কোনো স্বতন্ত্র হাসপাতাল নেই। কলেজ ক্যাম্পাস থেকে জেলা সদর হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার হওয়ায় প্রতিদিন ভাঙাচোরা রাস্তায় একটি মাত্র বাসের ওপর ভরসা করে যাতায়াত করতে হয় প্রায় ২৪০ জন শিক্ষার্থীকে। শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীদের এই দুর্বিষহ যাতায়াত অভিজ্ঞতা শিক্ষাজীবনকে চরম যন্ত্রণাদায়ক করে তুলেছে। এছাড়া পাবনা, যশোর ও জামালপুর মেডিকেল কলেজেরও নিজস্ব কোনো হাসপাতাল সংযুক্ত নেই।


অবকাঠামোগত সংকটের চেয়েও বড় ও মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে শিক্ষকস্বল্পতা। ১৬টি মেডিকেল কলেজেই শিক্ষক ও অধ্যাপকের পদ বড় আকারে শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে শোচনীয় দশা মাগুরা মেডিকেল কলেজের। এই প্রতিষ্ঠানে ৮৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩২ জন শিক্ষক, অর্থাৎ প্রায় ৬২ শতাংশ শিক্ষকের পদ খালি রেখেই চলছে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম। সুনমগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অবস্থা আরও করুণ, যেখানে ৪৫ শতাংশ পদ খালি। সাতক্ষীরায় ৩৯ শতাংশ এবং বাকি কলেজগুলোতেও একই ধরনের শিক্ষক সংকট বিরাজমান।


মেডিকেল শিক্ষায় আটটি মৌলিক বিষয়—অ্যানাটমি, বায়োকেমিস্ট্রি, কমিউনিটি মেডিসিন, ফরেনসিক মেডিসিন, মাইক্রোবায়োলজি, প্যাথলজি, ফার্মাকোলজি ও ফিজিওলজি—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ষোলটি মেডিকেল কলেজে এই আটটি মৌলিক বিষয়ের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের মোট ২৭২টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ১০০ জন। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, মৌলিক বিষয়ে প্রায় ৬৩ শতাংশ পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। নওগাঁ মেডিকেল কলেজে মৌলিক বিষয়ের ১৪টি পদের সবকটিই শূন্য। মাগুরায় ১৪টির মধ্যে ১৩টি, সুনামগঞ্জে ১৪টির মধ্যে ১২টি এবং হবিগঞ্জে ১৪টির মধ্যে ১১টি পদ ফাঁকা রয়েছে। পাবনা মেডিকেল কলেজের বয়স ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও মৌলিক বিষয়ের অর্ধেকের বেশি পদ শূন্য। বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে ২০১৬ সাল থেকে কেবল একজন মাত্র শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. রুহুল কুদ্দুস নিজে এবং গাইনি বিভাগে কোনো শিক্ষকই নেই।


শিক্ষক এবং উপযুক্ত ল্যাবরেটরি বা পরিকাঠামোর অভাবে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের রুটিনমাফিক আইটেম ও কার্ড পরীক্ষাগুলো কোনো রকমে নামেমাত্র সম্পন্ন হচ্ছে। ছোট ছোট অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বা রোগতত্ত্বের ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদারকি ছাড়া পাস করিয়ে দেওয়া চিকিৎসা শিক্ষার মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে স্পষ্ট প্রতারণা বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এই সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো সুফল মিলছে না। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন জানিয়েছেন যে, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং মৌলিক বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়ার মতো কিছু পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কাঠামোগত এই ঘাটতি রাতারাতি দূর করা অসম্ভব।


রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও মেডিকেল শিক্ষার এই বিশৃঙ্খলার অবস্থার তেমন কোনো মৌলিক সংস্কার সাধিত হয়নি। উল্টো অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নতুন নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের অনুমোদন প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল। স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নিজ জেলা মুন্সিগঞ্জে এবং নৌবাহিনীর অধীনে চট্টগ্রামে নতুন মেডিকেল কলেজ অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরও এই ধারা অব্যাহত রেখেছে। নরসিংদীতে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালকে কেন্দ্র করে নতুন মেডিকেল কলেজ চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, অথচ এই প্রতিষ্ঠানের জন্যও এখনো কোনো নির্দিষ্ট জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। একইভাবে ঠাকুরগাঁওয়ের পাশাপাশি ভোলা ও জয়পুরহাটে নতুন দুটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এলাকা পরিদর্শন করেছে।


যদিও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ঠাকুরগাঁও ও নরসিংদীর পর আপাতত নতুন কোনো সরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ২০৪১ সালের চাহিদা নিরূপণ করতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে, তবুও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ১৯৪৭ সালের ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে শুরু করে আজ অবধি দেশের মেডিকেল শিক্ষার অবকাঠামো এক বিশাল পথ অতিক্রম করলেও রাজনৈতিক প্রভাবে অপরিকল্পিতভাবে কলেজ প্রতিষ্ঠার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ না হলে দেশের স্বাস্থ্যখাত ও চিকিৎসাসেবার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। অভিজ্ঞ জনস্বাস্থ্যবিদ ও শিক্ষাবিদরা মনে করেন, মানসম্মত চিকিৎসক তৈরিতে পরিকাঠামো ও যোগ্য শিক্ষক ছাড়া এ ধরনের প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি এক ধরণের নিষ্ঠুর জুয়াখেলা।


এ সম্পর্কিত আরো খবর