সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন শিল্পকারখানার বিদ্যুৎ মিটার চুরি করে অভিনব কায়দায় বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে মুক্তিপণ বা টাকা আদায়কারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের দুই মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করেছে শিল্প পুলিশ। শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেলে আশুলিয়ার পলাশবাড়ী এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই চক্রের সদস্যরা দেড়শ থেকে দুই শতাধিক মিটার চুরির চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর উত্তরাস্থ শিল্প পুলিশ-১ এর প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূইয়া।
গ্রেপ্তারকৃত দুজন হলেন—সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার পাথরাইল গ্রামের কাইয়ুম আলীর ছেলে মো. সবুজ মিয়া ওরফে 'মিটার সবুজ' (২৫) এবং একই উপজেলার রেহাই পুকুরিয়া গ্রামের লিটন মোল্লার ছেলে মো. মারুফ মোল্লা (৩৫)। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সবুজ মিয়া ১৫০ থেকে ২০০টি এবং মারুফ মোল্লা ৬০ থেকে ৭০টি মিটার চুরির কথা স্বীকার করেছেন। তবে তাদের দেওয়া এই তথ্যের সত্যতা ও অন্যান্য ঘটনার সম্পৃক্ততা যাচাইয়ে পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চক্রের সদস্যরা বেশ কিছুদিন ধরে সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ের বিভিন্ন কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ মিটারকে টার্গেট করে আসছিল। কারখানা থেকে মিটার খুলে নেওয়ার পর তা দূরে কোথাও না নিয়ে অনেক সময় ঘটনাস্থলের আশপাশেই কোনো গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখা হতো। এরপর পলিথিনে মোড়ানো ছোট চিরকুটে একটি বিকাশ নম্বর লিখে ঘটনাস্থলে ফেলে রাখা হতো। মিটার চুরির বিষয়টি টের পেয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ ওই নম্বরে যোগাযোগ করলেই শুরু হতো দর-কষাকষি। নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা বিকাশে পাঠানোর পরেই কেবল গোপন স্থান থেকে মিটার ফিরিয়ে দেওয়া হতো।
তদন্তে জানা যায়, গত ৫ আগস্ট রাত আড়াইটার দিকে ধামরাইয়ের ঢুলিভিটা এলাকায় ‘দি একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড’-এর ১ নম্বর গেটের সামনে থেকে পল্লী বিদ্যুতের একটি মিটার চুরি হয়। ওই ঘটনায় ধামরাই থানায় মামলা দায়েরের পর ছায়া তদন্ত শুরু করে শিল্প পুলিশ-১। তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্থানীয় সোর্সের সহায়তায় বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও পাবনা অঞ্চলে চক্রটির গতিবিধি ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে আশুলিয়ার পলাশবাড়ী এলাকার ঘোড়াপীর মাজারসংলগ্ন মানিকগঞ্জ বুক হাউসের সামনে অভিযান চালায় শিল্প পুলিশের একটি দল। এ সময় সন্দেহভাজন একটি মোটরসাইকেলকে থামার সংকেত দিলে পালানোর চেষ্টার একপর্যায়ে মোটরসাইকেলটি পড়ে গিয়ে উভয়পক্ষ আহত হয়। পরে পুলিশ তাদের আটক করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের হেক্সিং ব্র্যান্ডের একটি মিটার (নম্বর: ১৭৩৯৯৩৯০), দুটি অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন (ভিভো Y21 D ও টেকনো KM9) এবং একটি বাজাজ পালসার ১৫০ সিসি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
শিল্প পুলিশের রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই শিল্পাঞ্চলের একমি ল্যাবরেটরিজ, স্টারলিং লন্ড্রি অ্যান্ড ডেনিমস, কাইজেন মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জে ডব্লিউ কোম্পানি, প্যাক অ্যান্ড টিম প্যাকেজিং, কাওফিং জিলেটিন, ম্যাকটেক করপোরেশন, আয়েশা ক্লোথিং, হুয়াই ইন্টারন্যাশনাল পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ, ইফাদ অটোস, ট্রেন্ড সেন্ডারস ট্রিমস, ইউবেস্ট (বাংলা) ফ্যাশন, টর্ক ডিজাইন, এম এম মাল্টিমাইন্ড নিট গার্মেন্টস, সিনলিয়ান ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি বাংলাদেশ ও ফেব্রিলাইফ ফ্যাশনসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে মিটার চুরির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে গ্রেপ্তারকৃতদের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সবুজ মিয়ার বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন থানায় চুরি, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত অন্তত ৬টি মামলা রয়েছে। অন্যদিকে মারুফ মোল্লার বিরুদ্ধে আশুলিয়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও মানিকগঞ্জের বিভিন্ন থানায় চুরি, দস্যুতা, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত ১০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। মিটার চুরির এই চক্রের সঙ্গে অন্য কারা জড়িত এবং অর্থ লেনদেনের নেপথ্যে আর কে বা কারা রয়েছে, তা উদঘাটনে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।