নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে গত আগস্ট মাসে সরকারি উদ্যোগে চালু হওয়া ‘পিংক বাস’ সার্ভিসে যাত্রীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও এর আর্থিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। শুরুর দিকে যাত্রীর খরা থাকলেও এক মাসের ব্যবধানে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। তবে সীমিত ট্রিপ এবং নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে বাসগুলো অলস পড়ে থাকায় সরকারকে প্রতিদিন বড় অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন (বিআরটিসি) সূত্রে জানা যায়, প্রথম ধাপে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার মোট ১৩টি রুটে ১৪টি বাস দিয়ে এই বিশেষায়িত নারী বাস সার্ভিস শুরু হয়। এর মধ্যে ঢাকার ১০টি রুটে একটি একতলা ও নয়টি দ্বিতল বাস, চট্টগ্রামে দুটি দ্বিতল এবং বগুড়ায় দুটি দ্বিতল বাস চলাচল করছে। গত ১৮ আগস্ট উদ্বোধনের পর ১৯ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০ দিনের কার্যদিবসে মোট ২৭২টি ট্রিপ সম্পন্ন হয়েছে। এই সময়ে প্রায় ২১ হাজার নারী যাত্রী সেবা নিয়েছেন, যার দৈনিক গড় দাঁড়ায় ১ হাজার ৪০ জনে। শুরুর সপ্তাহে যাত্রীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে না গেলেও সময়ের পরিক্রমায় তা দিনে প্রায় ১ হাজার ৩০০ জনে উন্নীত হয়েছে।
যাত্রীদের কাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ হাজার টাকা ভাড়া বাবদ আয় হলেও বাসগুলো সচল রাখতে সরকারকে দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ওই নির্দিষ্ট ২০ দিনে মোট আয় হয়েছে প্রায় তিন লাখ টাকা, বিপরীতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। সকালের নির্দিষ্ট কিছু সময় ছাড়া দিনের বেশিরভাগ সময় বাসগুলো ডিপোতে অলস বসে থাকে, যা এই লোকসানের অন্যতম প্রধান কারণ।
বিশেষায়িত এই বাস সার্ভিস নিয়ে যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী মনে করেন, সুনির্দিষ্ট কোনো জরিপ বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই এই অদূরদর্শী প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যা টেকসই না হয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। একইভাবে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান একে নারীদের সঙ্গে এক ধরনের উপহাস আখ্যা দিয়ে বলেন, বাসের রঙ বদলানোর চেয়ে বরং সব গণপরিবহনকে নারী ও শিশুবান্ধব করে তোলা উচিত।
অন্যদিকে, বিআরটিসির উপ-মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) শুকদেব ঢালী বাণিজ্যিক লাভের চেয়ে সেবামূলক মনোভাবকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার মতে, মাত্র এক মাসেই যাত্রীসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ায় এটি স্পষ্ট যে নারীদের মধ্যে এই সার্ভিসের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সামনের দিনে যাত্রীর চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া সম্প্রতি আরও ১০ জন নারী চালক যুক্ত হওয়ায় মোট নারী চালকের সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। চলতি মাসেই শুরু হবে তৃতীয় ধাপের প্রশিক্ষণ।
যাত্রীদের পক্ষ থেকেও কিছু বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। অনেক সময় নির্ধারিত স্টপেজে যাত্রী না থাকলে চালকরা বাস না থামিয়ে দ্রুত গন্তব্যে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। নারী চালকরা ট্রাফিক ও স্টপেজের ভিড়ে বাস সামলাতে কিছুটা অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করায় সময় কিছুটা বেশি লাগছে। পাশাপাশি, নির্দিষ্ট সময়সূচির অভাব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়ানোর কারণে কিছু নারী যাত্রীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে এবং সেবার মান বাড়াতে সরকার নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। খুব শীঘ্রই এই বহরে ওয়াই-ফাই, সিসি ক্যামেরা ও এসি সুবিধাসংবলিত আরও ১০০টি আধুনিক ও ছোট আকৃতির নতুন বাস যুক্ত করা হবে, যা সার্বিক পরিস্থিতি বদলে দেবে বলে সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস।