প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ভারত সফরের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রধান এবং বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দিল্লির মাটিতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতাদের রাজনৈতিক তৎপরতা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে এই কড়া বার্তা দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, প্রতিবেশী দেশের রাজধানী থেকে বাংলাদেশবিরোধী যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড কিংবা অস্থিতিশীলতা তৈরির পাঁয়তারা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের স্বাভাবিক অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর সাইডলাইনে ভারতীয় গণমাধ্যমটিকে এই সাক্ষাৎকার দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। এ সময় তিনি জানান, জুলাই-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের প্রকৃত অগ্রাধিকার ও চ্যালেঞ্জগুলো দিল্লির নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে স্বৈরাচারী শাসন টিকিয়ে রাখা এবং ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দমনের সময় দেশজুড়ে প্রায় দুই হাজার নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। তাকে একজন অভিযুক্ত সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, তাকে আশ্রয় দেওয়া দেশটিতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত অব্যাহত রাখা কোনোভাবেই প্রতিবেশীসুলভ আচরণ হতে পারে না।
শেখ হাসিনা ও তার অনুসারীদের এই ধরনের ক্ষতিকর রাজনৈতিক তৎপরতা কেবল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্যই হুমকিস্বরূপ নয়, বরং এতে খোদ ভারতেরও কোনো ভূরাজনৈতিক বা কৌশলগত সুবিধা অর্জিত হচ্ছে না বলে স্পষ্ট মন্তব্য করেন হুমায়ুন কবির। তিনি মনে করেন, অতীতের দীর্ঘ দুঃশাসন ও নৃশংসতার ইতিহাস থেকে দেশের সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছেদ ঘটার যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাকে দিল্লির পক্ষ থেকেও সম্মান জানানো উচিত। দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের আস্থার সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে হলে পলাতক এই রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কঠোরভাবে ও স্থায়ীভাবে সংযত রাখা অত্যন্ত অপরিহার্য।
বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকার তালিকার সর্বাগ্রে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের বিষয়টি রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী জানান, এই আস্থার সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলমান রয়েছে এবং ঢাকাকে উভয় পক্ষ থেকেই ইতিবাচকভাবে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর গঠনমূলক, পেশাদার ও আন্তরিক কূটনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থরক্ষার খাতিরে বর্তমান পরিস্থিতি একটি ইতিবাচক ধারায় মোড় নিচ্ছে এবং ভারত সরকার তাদের সংযত রাখার চেষ্টা করছে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সব জটিলতা ও চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে একটি উপযুক্ত এবং অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করবেন বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি পরিষ্কার করে জানান, প্রধানমন্ত্রী কখনো ভারত সফর করবেন না এমন কোনো ঘোষণা দেননি। তবে এই সফর সফল ও ফলপ্রসূ করার পূর্বশর্ত হলো—দিল্লিতে বসে অস্থিতিশীলতা তৈরির সব অপচেষ্টা চিরতরে বন্ধ করা। যদি অভিযুক্তদের সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়, তবে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আর কোনো কালো মেঘ বা জটিলতা অবশিষ্ট থাকবে না।