ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬,  ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বসছে এআই ক্যামেরা, আইন ভাঙলেই স্বয়ংক্রিয় মামলা ফ্যাসিস্টরা স্বাস্থ্যখাতকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে জাপান সফরে নতুন ৪টি সমঝোতা স্মারক সই পাশাপাশি চার কবরে চিরনিদ্রায় একই পরিবারের চার সদস্য স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা: নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৪, আহত ৮০ ঢামেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ধর্মঘট ৭ দিনের জন্য স্থগিত ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: ১৮৫ কেন্দ্রের মধ্যে ১১৫টিই অধিক ঝুঁকিপূর্ণ প্রগতির আড়ালে নৈতিক দেউলিয়া সমাজ: বিশ্ব যখন শেখায়, আমরা তখন পিছিয়ে সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ১ রান দূরে সাদমান, প্রথম দিনে বাংলাদেশের সংগ্রহ ২১৩ স্পেনে দ্রুতগতির দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত অন্তত ৪৬

বেপরোয়া অটোরিকশার ধাক্কায় থমকে যাচ্ছে মানুষের জীবন


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ০৮ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ১০:০১ এএম

মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মর্মান্তিক একটি মুহূর্ত আর বেপরোয়া গতির একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা—এটুকুই যথেষ্ট একটি হাসিখুশি ও সচ্ছল পরিবারের ভবিষ্যৎ চিরতরে অন্ধকার করে দেওয়ার জন্য। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সড়কে দিন দিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করা এই অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত যানের দৌরাত্ম্যে প্রতিদিন পঙ্গুত্ব বরণ করছেন নানা বয়সী সাধারণ মানুষ। মুহূর্তের অসাবধানতা কিংবা চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের বলি হয়ে কাউকে হারাতে হচ্ছে শরীরের অমূল্য অঙ্গ, কেউ বা মাসের পর মাস শয্যাশায়ী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। একটিমাত্র দুর্ঘটনা কেবল শারীরিক যন্ত্রণাই ডেকে আনছে না, বরং পুরো পরিবারটিকে করে তুলছে চরমভাবে নিঃস্ব ও অসহায়।

 

এরই এক করুণ বাস্তব উদাহরণ হলেন ৭৬ বছর বয়সী বৃদ্ধ রওশন আলী। জীবনের এই প্রান্তবেলায় যেখানে পরিবারের সদস্যদের স্বস্তি ও নির্ভরতার প্রতীক হওয়ার কথা ছিল তাঁর, সেখানে উল্টো এখন অন্যের করুণার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন তিনি। সড়কে একটি বেপরোয়া অটোরিকশার নির্মম ধাক্কায় তাঁর জীবনচিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। জীবন বাঁচাতে গিয়ে তাঁকে হারাতে হয়েছে নিজের ডান পা। চিকিৎসার চাকা সচল রাখতে গিয়ে জীবনের সারা জীবনের জমানো সব সঞ্চয় ও সম্বল নিঃশেষ হয়ে গেছে, তবুও ফেরেনি তাঁর স্বাভাবিক ও স্বাধীন জীবন। বয়সের ভারে শরীর নুইয়ে পড়লেও যিনি জীবিকা ও জীবনযুদ্ধে কখনো হার মানেননি, আজ তাঁকে কৃত্রিম পা কিংবা অন্যের হাতের সাহায্য ছাড়া এক পাও সামনে এগোতে হচ্ছে না। চরম ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ করে রওশন আলী বলেন, "আমি একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলাম। আমার টাকা-পয়সা সব শেষ করে দিয়েছে। এখন আমি পথের ভিখারি। আপনারা দোয়া করে যদি অটোরিকশা বাতিল করেন, তাহলে মানুষ বাঁচবে।"

 

রওশন আলীর মতো এমন মর্মান্তিক পরিণতি কেবল তাঁর একার নয়, বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতিদিনের চিত্র এটি। সড়কে বেপরোয়া অটোরিকশার শিকার হয়ে হাসপাতালে ছুটছে সমাজের নানা স্তরের মানুষ। যেমনটি দেখা গেছে হাসপাতালের মেঝেতে তীব্র ব্যথায় কাতরাতে থাকা মাত্র পাঁচ বছরের শিশু আবদুল্লাহর ক্ষেত্রে। ছোট্ট এই শিশুটির হাতের মুঠোয় থাকা খাবার কেনার খুচরা টাকাগুলো তখনো ঝরঝরে ছিল, কিন্তু এক মুহূর্তের ব্যবধানে এক বেপরোয়া অটোরিকশা তার জীবনের আনন্দ কেড়ে নেয়। রাস্তা পার হওয়ার সময় চালকের বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন আচরণের কারণে শিশুটি মারাত্মকভাবে আহত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে। শিশুটির বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ঘরের বাইরে ছোট্ট শিশুটি খাবার কেনার বায়না ধরেছিল এবং তাকে রাস্তার পাশের দোকানে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি, ঠিক তখনই ঘাতক অটোরিকশাটি এসে তাদের চাপা দেয়।

 

অন্যদিকে, রঙিন স্বপ্ন আর উন্নত ভবিষ্যতের আশায় বুক বেঁধে নতুন চাকরির সন্ধানে সাভারের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন মাসুদ নামের এক তরুণ। কিন্তু সড়কের একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা তাঁর সমস্ত সুন্দর ভাবনা ও গন্তব্যকে এক নিমেষে ঘুরিয়ে দিয়েছে হাসপাতালের চার দেওয়ালের মাঝে। দুর্ঘটনার ভয়াবহ স্মৃতিচারণ করে মাসুদ জানান, হঠাৎ চোখের সামনে একটি গাড়ি আসতে দেখে চালক তার যানের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে এবং তাঁকে সোজা একটি বৈদ্যুতিক খুঁটি ও দেওয়ালের চিপায় সজোরে চেপে ধরে। এতে তাঁর শরীর মারাত্মকভাবে জখম হয়। ঘটনার পর থেকে এ পর্যন্ত তাঁর চিকিৎসার পেছনে পঞ্চাশ হাজার টাকারও বেশি অর্থ ব্যয় হয়ে গেছে, অথচ তিনি মানসম্মত ও যথাযথ চিকিৎসা সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে নিয়মনীতিহীনভাবে চলাচলকারী এসব ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন জনজীবনের জন্য এক নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের শরীরকেই আঘাত করে না, বরং পুরো পরিবারটির আয়-রোজগার ও জীবিকাকে চিরতরে থমকে দেয়। সুচিকিৎসার অতিরিক্ত ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারগুলো সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে, ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ে চরম অনিশ্চিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। দ্রুত এই বেপরোয়া যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে সড়কে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব হবে না।


এ সম্পর্কিত আরো খবর