রফিকুল ইসলাম রাজু
“কেহ
নাহি চাহে কারে, মিলিবারে
চায়,
যে
যাহার আপনার সমুখে চলিয়া যায়;
নিমেষের
দেখাশুনা, নিমেষের পরিচয়,
নিমেষের
সুখটুকু ক্ষণিকের তরে রয়।”
— কবিগুরু
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেন তাঁর ‘সোনার
তরী’ কাব্যের এই চরণে আধুনিক
যান্ত্রিক নগরের পরম নির্মমতাকে আগেভাগেই
এঁকেছিলেন। কিন্তু যান্ত্রিকতার এই অন্ধবেগ যে
একদিন আক্ষরিক অর্থেই মানুষের প্রাণ কেড়ে নেবে, তা
হয়তো তাঁর কল্পনাতেও ছিল
না।
গত
২৪ অক্টোবর ২০২৬, একটি সাধারণ বিকেলের
পড়ন্ত আলোয় ঢাকা মেট্রোরেলের
একটি চকচকে কামরায় যা ঘটে গেল,
তা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা
নয়। এটি আমাদের তথাকথিত
প্রগতি, আধুনিকতা এবং উন্নয়ন-বয়ানকে
এক লহমায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কাঠগড়ায় দাঁড়
করিয়ে দিয়েছে।
জাতীয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাজিবুর
রহমান শাহবাগ থেকে উত্তরা যাওয়ার
পথে ট্রেনের ভেতরেই স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি শারীরিকভাবে প্রচণ্ড অসুস্থ বোধ করছিলেন, হাতল
ধরে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতাটুকুও হারাচ্ছিলেন। বারবার সহযাত্রীদের কাছে একটু বসার
আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত
আধুনিক বাহনের পাথুরে ভিড়ে কেউ একজন
প্রবীণ, অসুস্থ শিক্ষককে একটুখানি বসার জায়গা দেওয়ার
প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। হাতল ধরে ঝুলতে
ঝুলতে একসময় তিনি ট্রেনের মেঝেতে
লুটিয়ে পড়েন এবং মৃত্যুর
কোলে ঢলে পড়েন।
তাঁর
সন্তান নাকিবুর রহমান কোনো মামলা করেননি,
কারও প্রতি ক্ষোভ উগরে দেননি। কিন্তু
তিনি যে করুণ আক্ষেপটি
প্রকাশ করেছেন, তা এই ১৬
কোটি মানুষের সমাজের মুখে এক জ্বলন্ত
চপেটাঘাত: “আজীবন একটাই আক্ষেপ থাকবে, কেউ যদি আব্বুকে
একটু বসতে দিতেন, তাহলে
হয়তো বাবা এভাবে নিচে
না পড়ে কারও কোলে
মাথা রেখে শান্তিতে মরতে
পারতেন।”
একটি
আসন হয়তো তাঁর অবধারিত
মৃত্যুকে ঠেকাতে পারত না, কিন্তু
মানুষের তৈরি এই সভ্যতায়
মানুষের প্রতি মানুষের শেষ ভালোবাসার এক
টুকরো প্রমাণ তো রেখে যেতে
পারত!
আত্মকেন্দ্রিকতার
চোরাবালি: আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের উৎসঃ
ড.
নাজিবুর রহমানের এই মর্মান্তিক প্রস্থান
কোনো একক ব্যক্তির অপরাধ
নয়, এটি আমাদের সামষ্টিক
সামাজিক মূল্যবোধের দেউলিয়াত্ব। আমরা কেন আজ
এতটা নিচে নেমে গেলাম?
প্রথমত,
আমাদের পারিবারিক শিক্ষার চাকাটি আজ উল্টো ঘুরছে।
বর্তমান পুঁজিবাদী ও প্রতিযোগিতামূলক সমাজ
ব্যবস্থায় সন্তানদের আমরা জিপিএ-৫
পাওয়ার অন্ধ দৌড়ে নামিয়ে
দিয়েছি। জিপিএ-৫ কিংবা ভালো
ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে গিয়ে সন্তানটি একজন
সংবেদনশীল মানুষ হয়ে উঠছে কি
না, সেই খবর রাখার
সময় আধুনিক বাবা-মায়ের নেই।
শিক্ষার অর্থ আজ শুধু
অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হওয়া, অন্যকে সম্মান করা বা বিপদে
হাত বাড়িয়ে দেওয়া নয়। ফলে শিক্ষা
যত বাড়ছে, অহংকার ততটাই জাঁকিয়ে বসছে।
দ্বিতীয়ত,
নাগরিক ক্লান্তি এবং যান্ত্রিক জীবন
আমাদের ভেতর থেকে সমবেদনার
শেষ রসটুকুও শুষে নিচ্ছে। প্রতিদিনকার
জ্যাম, কাজের চাপ আর প্রযুক্তির
অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষকে স্ক্রিন-নির্ভর রোবটে পরিণত করেছে। পাশের মানুষটি যে ব্যথায় নীল
হয়ে যাচ্ছে, তা দেখার চোখ
বা মানসিক ফুরসত আজ আর নগরবাসীর
নেই।
তৃতীয়ত,
আমাদের দেশে এখনও প্রবীণবান্ধব
বা সংবেদনশীল নগর কাঠামো গড়ে
ওঠেনি। উন্নত দেশে প্রবীণ বা
অসুস্থদের অধিকার আইন দ্বারা সুরক্ষিত,
কিন্তু আমাদের গণপরিবহন কিংবা জনাকীর্ণ স্থানগুলোতে প্রবীণদের সম্মান দেওয়া বা আসন ছেড়ে
দেওয়াকে দয়া বা করুণা
মনে করা হয়, অধিকার
নয়。
প্রবীণদের
সম্মান: বৈশ্বিক সংস্কৃতির আয়নায় আমাদের দীনতাঃ
আমরা
যখন একজন মুমূর্ষু অধ্যাপককে
বসার জায়গা দিতে কার্পণ্য করছি,
তখন পৃথিবীর উন্নত ও সভ্য দেশগুলো
প্রবীণদের সমাজ ও রাষ্ট্রের
পরম সম্পদ মনে করে তাদের
সুরক্ষায় গড়ে তুলেছে অসাধারণ
সব উদাহরণ।
১.
জাপানের 'সিলভার সিট' ও প্রাথমিক
শিক্ষা
জাপানি
সংস্কৃতিতে প্রবীণদের স্থান সবার ওপরে। জাপানের
প্রতিটি পাতাল রেল এবং বাসে
বিশেষায়িত ‘সিলভার সিট’ (Silver Seats) থাকে। প্রবীণ, গর্ভবতী ও প্রতিবন্ধী ছাড়া
সাধারণ মানুষ সেখানে বসার কথা চিন্তাও
করে না। যদি কোনো
সাধারণ সিটে বসে থাকা
অবস্থায় কোনো প্রবীণ রেলে
ওঠেন, জাপানি তরুণরা মুহূর্তের মধ্যে আসন ছেড়ে মাথা
নত করে ক্ষমা চেয়ে
বিদায় নেয়। প্রতি বছর
সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সোমবার তারা পালন করে
‘কেইরো নো হি’ বা
প্রবীণ সম্মান দিবস। জাপানি স্কুলগুলোতে শিশুদের হাতে-কলমে শেখানো
হয় কীভাবে রাস্তায় কোনো বয়োবৃদ্ধের ভারী
ব্যাগটি বহন করে দিতে
হয় কিংবা রাস্তা পারাপারে সাহায্য করতে হয়।
২.
দক্ষিণ কোরিয়ার 'জন্দেতমাল' ও সাবওয়ে শিষ্টাচার
কোরিয়ান
সমাজে বয়সকে জ্ঞান ও পরম অভিজ্ঞতার
প্রতীক মনে করা হয়।
কোরিয়ান ভাষায় প্রবীণ বা বয়সে বড়দের
সাথে কথা বলার জন্য
সম্পূর্ণ আলাদা ও উচ্চ সম্মানসূচক
ব্যাকরণ ও ভাষা রীতি
রয়েছে, যাকে বলা হয়
‘জন্দেতমাল’
(Jondetmal)। দক্ষিণ কোরিয়ার সাবওয়েগুলোতে তরুণরা সারাদিনের খাটুনি শেষে অত্যন্ত ক্লান্ত
থাকলেও প্রবীণদের জন্য নির্ধারিত আসনগুলো
ফাঁকা রাখে। কোনো বয়োবৃদ্ধ ট্রেনে
উঠলে তরুণদের সিট ছেড়ে দেওয়া
সেখানে এক অলিখিত সামাজিক
আইন।
৩.
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘সামাজিক
চাপ’ (Social Policing)
লন্ডন
আন্ডারগ্রাউন্ড এবং নিউ ইয়র্ক
সাবওয়েতে স্পষ্ট অক্ষরে সাঁটানো থাকে—“Please offer this seat
to those who are less able to stand”।
এই দেশগুলোতে যদি কোনো তরুণ
কোনো প্রবীণ বা অসুস্থ মানুষকে
দেখেও সিট না ছেড়ে
বসে থাকে, তবে সহযাত্রীরা তাকে
তীব্র ভর্ৎসনা করেন। একে বলা হয়
‘সোশ্যাল পলিসিং’। ব্যাংক, সুপারমার্কেট
কিংবা যেকোনো সরকারি কাউন্টারে সেখানে ‘সিনিয়র সিটিজেন’দের জন্য সম্পূর্ণ
আলাদা ও অগ্রাধিকারমূলক লাইন
থাকে।
৪.
সিঙ্গাপুর ও কানাডার রাষ্ট্রীয়
ও সামাজিক সুরক্ষা
সিঙ্গাপুরে
গণপরিবহনে প্রবীণদের সিট না দেওয়াকে
সামাজিক নীতিমালার চরম লঙ্ঘন মনে
করা হয় এবং এর
জন্য সামাজিকভাবে তীব্র তিরস্কারের মুখোমুখি হতে হয়। অন্যদিকে,
কানাডায় প্রবীণদের প্রায় ‘ভিআইপি’র মর্যাদা দেওয়া
হয়। প্রতিটি হাসপাতালে তাদের জন্য আলাদা প্রবীণ
কেয়ার উইং রয়েছে, সরকারি
সব সুযোগ-সুবিধায় রয়েছে অগ্রাধিকার এবং গণপরিবহনে নামমাত্র
মূল্যে বা বিনামূল্যে যাতায়াতের
পাস দেওয়া হয়।
৫.
চীনের কঠোর ‘পিতামাতা অধিকার আইন’
কনফুসীয়
দর্শনের ওপর ভিত্তি করে
গড়ে ওঠা চীনে প্রবীণদের
সেবা করা পরম ধর্ম।
চীনের বহু শহরে বাস
বা মেট্রোতে কোনো প্রবীণকে আসন
ছেড়ে না দেওয়া রীতিমতো
শাস্তিযোগ্য অপরাধ ও জরিমানা আদায়ের
কারণ হতে পারে। এছাড়া
চীনে ‘Elderly Rights
Law’ বা বৃদ্ধ পিতামাতার শারীরিক ও মানসিক যত্ন
নেওয়া সন্তানদের জন্য আইনত বাধ্যতামূলক
করা হয়েছে।
৬.
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (জার্মানি, ফ্রান্স ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশসমূহ)
জার্মানি
ও ফ্রান্সে গণপরিবহনগুলো তৈরিই করা হয় প্রবীণ
ও প্রতিবন্ধীবান্ধব করে। বাস ও
ট্রেনের মেঝে ফুটপাথের সাথে
সমান্তরাল (Low-floor) থাকে যেন প্রবীণরা
অনায়াসে উঠতে পারেন। সবচেয়ে
বড় কথা, এই দেশগুলোতে
বাসের চালকরা প্রবীণ যাত্রীরা সিটে গিয়ে নিরাপদে
না বসা পর্যন্ত গাড়ি
স্টার্ট করেন না।
ড.
নাজিবুর রহমানের এই অকাল ও
করুণ বিদায় আমাদের বিবেকের দরজায় শেষ করাঘাত। এই
নৈতিক পচন থেকে যদি
আমরা সমাজ ও রাষ্ট্রকে
রক্ষা করতে না পারি,
তবে আমাদের সব উন্নয়ন ও
প্রবৃদ্ধি অর্থহীন হয়ে যাবে। এই
মুহূর্তে আমাদের করণীয়:
ক.
গণপরিবহনে কঠোর আইন ও
নীতি নির্ধারণ: মেট্রোরেল, বাস, লঞ্চসহ সকল
গণপরিবহনে প্রবীণ, অসুস্থ ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের
জন্য আসন সংরক্ষণ কেবল
স্টিকার লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।
প্রবীণদের আসন না ছাড়লে
কঠোর জরিমানা বা ট্রেন থেকে
নামিয়ে দেওয়ার মতো আইনি বাধ্যবাধকতা
তৈরি করতে হবে।
খ.
পাঠ্যক্রমে মানবিক শিক্ষার বাস্তব রূপায়ণ: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের
পাঠ্যপুস্তকে কেবল তাত্ত্বিক নীতিবাক্য
রাখলে চলবে না। শিক্ষার্থীদের
নম্বর বা গ্রেডিংয়ের একটি
অংশ নির্ধারণ করতে হবে তাদের
বাস্তব সামাজিক আচরণ, শিষ্টাচার এবং প্রবীণদের প্রতি
সহানুভূতির ওপর ভিত্তি করে।
গ.
গণমাধ্যমের জোরালো ভূমিকা: দেশের শীর্ষস্থানীয় টেলিভিশন, সংবাদপত্র এবং সামাজিক যোগাযোগ
মাধ্যমে প্রবীণদের অধিকার এবং গণপরিবহন শিষ্টাচারের
ওপর নিয়মিত সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ও প্রামাণ্যচিত্র প্রচার
করতে হবে।
ঘ.
পারিবারিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ: বাবা-মায়েদের বুঝতে
হবে, সন্তানকে জিপিএ-৫ পাইয়ে বুয়েট-মেডিকেলে পড়ানোর চেয়েও বড় দায়িত্ব হলো
তাকে একজন সংবেদনশীল এবং
দয়াশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
ভূপেন হাজারিকার সেই বিখ্যাত গানের কলি আজ বড় বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে আমাদের এই যান্ত্রিক নগরে—
“মানুষ
মানুষের জন্যে / জীবন জীবনের জন্যে
/ একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে
পারে না? / ও বন্ধু...”
মেট্রোরেলের
সেই কামরায় অধ্যাপক ড. নাজিবুর রহমান
একটুখানি সহানুভূতির আসনই খুঁজেছিলেন। আমরা
তাঁকে সেই আসনটি দিতে
পারিনি। আজ আমরা যদি
অন্য কারও বাবাকে মেট্রোরেলে
অবহেলা করি, তবে আমাদের
মনে রাখা দরকার—মহাকালের
নিয়মে আগামীকাল আমাদের নিজেদের বাবা কিংবা ভবিষ্যতে
আমরা নিজেরাও এই একই নির্মম
ও পাথুরে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারি।
হৃদয়ের
এই জড়তা, অহমিকা আর যান্ত্রিকতার দেয়াল
ভেঙে এখনই আমাদের ‘মানুষ’
হতে হবে। তা না
হলে এই আধুনিক ঢাকা
শহর হয়তো একদিন সুউচ্চ
অট্টালিকা আর বুলেট গতিতে
ভরে যাবে, কিন্তু তার ভেতরে বেঁচে
থাকবে কেবল কিছু চলন্ত
লাশ, কোনো জ্যান্ত মানুষ
নয়।
আকাশজমিন
/ আরআর