একসময়ে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত সোনালি আঁশ খ্যাত পাটশিল্প তার সোনালী দিনগুলো পেছনে ফেলে একসময় গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়েছিল। আদমজী জুট মিলস বন্ধ হওয়ার পর একে একে বাওয়ানী ও আমিন জুট মিলের মতো সরকারি বৃহৎ পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে বেসরকারি খাতের বহু কারখানা থেকেও উৎপাদন চিরতরে গুটিয়ে নেওয়া হয়। এর ফলে একদিকে যেমন দেশের পাট উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হোঁচট খায়, অন্যদিকে বেকার হয়ে পড়েন হাজার হাজার শ্রমিক।
তবে বর্তমান সময়ে দেশের বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্পকারখানাগুলোকে পুনরায় সচল করে অর্থনৈতিক চাকা সচল করার উদ্যোগের সঙ্গে সংগতি রেখে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আবুল খায়ের গ্রুপ। নতুন কোনো কারখানা স্থাপনে বিশাল অঙ্কের অর্থ ও সময় অপচয় না করে, বিদ্যমান অবকাঠামো এবং অব্যবহৃত উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া বেসরকারি পাটকলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার এক প্রশংসনীয় কৌশল হাতে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই সফল উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে বন্ধ থাকা বেশ কয়েকটি রুগ্ণ ও অচল পাটকল পুনরায় চালুর মুখ দেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফরিদপুরের রাজ্জাক জুট ইন্ডাস্ট্রিজ, ফরিদপুর জুট মিল ও দামাশি জুট মিল; খুলনার আহিয়ান জুট মিল; কুষ্টিয়ার নাসির জুট মিল এবং মাগুরার এ আর জুট মিল। আবুল খায়ের গ্রুপের এই সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপে কারখানাগুলোতে পুনরায় পুরোদমে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব মিল থেকে উৎপাদিত উচ্চমানের পাটের সুতা বর্তমানে তুরস্ক ও চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক বাজারে সফলভাবে রপ্তানি করা হচ্ছে।
গ্রুপটি এই কারখানাগুলোর মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৮০ হাজার মেট্রিক টন পাটের সুতা ও বহুমুখী পাটজাত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রেরণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এই বহুমুখী উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমের সুবাদে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় ১৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে এক দারুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শুধু বেসরকারি কারখানা নয়, এর পাশাপাশি সরকারি খাতের আরও তিন থেকে চারটি বন্ধ পাটকল পুনরায় চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারণী কর্তৃপক্ষের কাছে সুনির্দিষ্ট আবেদন নিবেদন করেছে আবুল খায়ের গ্রুপ।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পেছনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে আবুল খায়ের গ্রুপের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল শেখ শাবাব আহমেদ বলেন, পাটপণ্যের ব্যবসা অত্যন্ত বেশি মাত্রায় মূলধননির্ভর। দেশের বেসরকারি খাতে বহু পাটকল দীর্ঘদিন যাবৎ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। তাই নতুন করে কারখানা গড়ে তোলার পরিবর্তে আমরা বিদ্যমান বন্ধ কারখানাগুলোর সুদৃঢ় অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এর ফলস্বরূপ একদিকে যেমন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পগুলো উৎপাদনে ফিরে আসছে, অন্যদিকে তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি দেশের রপ্তানি বাণিজ্য আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন যে, বাংলাদেশের উৎপাদিত পাটের অতুলনীয় গুণগত মান আন্তর্জাতিকভাবে সর্বমহলে স্বীকৃত এবং বর্তমান বিশ্বে পরিবেশবান্ধব টেকসই পণ্যের চাহিদা দিন দিন অবিশ্বাস্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই বৈশ্বিক সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই আবুল খায়ের গ্রুপ পাট ও পাটজাত শিল্পে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের এই সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁদের পরবর্তী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো সাধারণ সুতার পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ভ্যালু-অ্যাডেড পাটপণ্য উৎপাদন ও বিশ্ববাজারে এর সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা।
বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাকে পুনরায় উৎপাদনের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা, ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সোনালি আঁশকে আন্তর্জাতিক বাজারে এক শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছে আবুল খায়ের গ্রুপ। এই ব্যতিক্রমী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ দেশের সামগ্রিক পাটশিল্পে এক নতুন জাগরণ ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।